গণভোট ও সংবিধান সংস্কার বিতর্কের শেষ কোথায়?

লেখক: নিউজ আউটলুক ডেস্ক
প্রকাশ: ৩ সপ্তাহ আগে

বাংলাদেশে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে করা গণভোট অধ্যাদেশ সরকারি দল বিএনপি সংসদে উত্থাপন না করার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবেই বাতিল হয়ে যাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। দলটি বলেছে, গণভোট হয়ে যাওয়ায় অধ্যাদেশটি আর সংসদে তোলার প্রয়োজন নেই।

যদিও বিরোধী দলীয় নেতা শফিকুর রহমানের তোলা একটি প্রস্তাবের ওপর সংসদে আলোচনায় অংশ নিয়ে গতকাল মঙ্গলবার বিরোধী দলীয় সদস্যরা বলেছেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়নে যে সংস্কার দরকার তা সংবিধান সংশোধন করে হবে না। বরং তাদের মতে, এজন্য দরকার হবে সংবিধান সংস্কার।

ওই আলোচনায় সরকারি দল বিএনপির সদস্যরা বলেছেন, ‘জাতীয় জুলাই সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ ২০২৫’ রাষ্ট্রপতি জারি করলেও সেই এখতিয়ারই তার ছিল না। রাষ্ট্রপতির ওই আদেশ বৈধ আইন নয় বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।

তিনি সংসদে আলোচনায় অংশ নিয়ে বলেন, এ আদেশ অন্তর্বর্তী সরকারের অন্তহীন প্রতারণার দলিল। এটি অবৈধ আদেশ। তবে আমরা জুলাই সনদের প্রতিটি শব্দ ও বাক্য ধারণ করি। আমরাই গণভোটের প্রস্তাব দিয়েছিলাম জুলাই সনদের ভিত্তিতে।

তিনি অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা গণভোটের অধ্যাদেশকে ‘জাতীয় প্রতারণার দলিল’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।

এর আগে সংসদ সদস্যদের শপথ গ্রহণের সময় বিএনপির সদস্যরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেননি। যদিও জামায়াত জোটের সদস্যরা সেই শপথ নিয়েছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বিএনপির অনাগ্রহে সংবিধান সংস্কার পরিষদ আর হয়নি।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ঐকমত্য কমিশনের সঙ্গে কাজ করার বিশ্লেষকরা বলছেন, বিএনপি তার রাজনৈতিক অঙ্গীকার রাখেনি বলেই এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে এবং তাদের মতে, এটি ভবিষ্যতে দেশের রাজনীতিতে নতুন সংকট তৈরি করবে।

যদিও বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ ইতোমধ্যেই জাতীয় সংসদে বলেছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে রাষ্ট্র সংস্কারের জন্য যে জুলাই সনদ হয়েছে সেটি তারা বাস্তবায়ন করবে।

বাংলাদেশে ২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে গঠিত জাতীয় ঐকমত্য কমিশনে রাজনৈতিক দলগুলোর ধারাবাহিক আলোচনার পর ২০২৫ সালের ১৭ই অক্টোবর ‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’ স্বাক্ষরিত হয়েছিল।

একই বছরের ১৩ নভেম্বর জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ গেজেট আকারে প্রকাশ করা হয়।

পরে জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ অনুসারে সংবিধান সংস্কার সম্পর্কিত কতিপয় প্রস্তাবের বিষয়ে জনগণের সম্মতি রয়েছে কি না তা যাচাইয়ে ২৫ নভেম্বর গণভোট অধ্যাদেশ, ২০২৫ জারি করা হয়।

তার ভিত্তিতে গত ১২ ফেব্রুয়ারি সংসদ নির্বাচনের দিন একই সাথে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং তাতে ‘হ্যাঁ’ ভোট জয়ী হয়েছে।

বিএনপির বিরোধিতা ও অনিহা

সংসদ নির্বাচনের সময় বিএনপি কেন ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে ভোট চাইছে না- জামায়াত ও সমমনা দলগুলোর নেতাকর্মীরা এমন প্রচারণাও চালান। এমন প্রেক্ষাপটে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান একটি জনসভায় ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন।

কিন্তু দলটি আগে থেকেই বলে আসছিল ঐকমত্য কমিশনের সভায় যেসব বিষয়ে দলগুলো একমত হয়নি বা যেগুলোতে নোট অব ডিসেন্ট এসেছে সেগুলো দলগুলো তাদের মতো করে নির্বাচনী ইশতেহারে দেবে এবং ভোটারদের রায় পেলে তারা সেভাবেই তা বাস্তবায়ন করবে।

রোববার সংসদে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, ‘বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল তাদের নির্বাচনী ইশতেহারের ভিত্তিতে জনগণের ম্যান্ডেট পেয়েছে, যা সংস্কার প্রক্রিয়ায় প্রতিফলিত হওয়া উচিত।’

তিনি তখন এও বলেছেন, ‘সরকার ও বিরোধী দলের সদস্যদের সমন্বয়ে একটি ‘সংবিধান সংস্কার কমিটি’ গঠন করা যেতে পারে এবং এ কমিটি সংবিধান বিশেষজ্ঞ, রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজসহ সংশ্লিষ্ট সবার মতামত নিয়ে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সংসদে প্রতিবেদন জমা দিতে পারে।’

তবে ওইদিন বিরোধীদলীয় নেতা মো. শফিকুর রহমান তার প্রস্তাবে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ অনুযায়ী, সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বান বিষয়ে আলোচনার জন্য সংসদের কার্যক্রম স্থগিত রাখার আহ্বান জানান।

লিখিত বক্তব্যে শফিকুর রহমান বলেন, ‘গত ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে অনুষ্ঠিত গণভোটে ৭০ শতাংশ মানুষ ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ায় জনগণ এই বাস্তবায়ন আদেশের পক্ষে রায় দিয়েছে। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট বিজয়ী হওয়ায় নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যরা আইনগতভাবে সংসদ সদস্য এবং সংবিধান সংস্কার পরিষদ-উভয় হিসেবেই শপথ নিতে বাধ্য।’

সালাহউদ্দিন আহমদ অবশ্য ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ প্রসঙ্গে ওইদিন বলেছেন, এটি একটি রাজনৈতিক সমঝোতার দলিল হলেও এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংবিধান সংশোধন করে না, “সংবিধানের যেকোনো পরিবর্তন সংসদে বিল পাসের মাধ্যমে যথাযথ আইন প্রণয়নের প্রক্রিয়ায়ই করতে হবে।’

এখন কী হবে

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা অধ্যাদেশগুলো চলতি ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশনের প্রথম দিনেই সংসদে উত্থাপন করা হয়। নিয়মানুযায়ী, উত্থাপনের পরবর্তী ৩০ দিন, অর্থাৎ আগামী ১২ এপ্রিলের মধ্যে এসব অধ্যাদেশের যেগুলো সংসদে অনুমোদিত হবে না সেগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হবে যাবে।

সংসদে উত্থাপনের পর এসব অধ্যাদেশ যাচাই-বাছাইয়ের জন্য একটি বিশেষ কমিটিতে পাঠানো হয়েছে। ওই কমিটির সভাতেই সরকারি দল জানিয়ে দিয়েছে, গণভোট অধ্যাদেশ সংসদে উত্থাপন করা হচ্ছে না।

এছাড়া মানবাধিকার কমিশন, বিচারপতি নিয়োগ, গুম প্রতিরোধ, দুর্নীতি দমন কমিশন অধ্যাদেশসহ কয়েকটি অধ্যাদেশে পরিবর্তন আনার কথা বলেছে বিএনপি। যদিও বিএনপির এমন অবস্থানের বিরুদ্ধে আপত্তি করে নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছে জামায়াত।

জামায়াত জোটে থাকা এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন সংসদে সাংবাদিকদের বলেছেন, বিএনপি যাই করুক না কেন, তারা মনে করেন ‘গণভোট বৈধ এবং আইনগতভাবে তার বৈধতা কখনোই বাতিল করা যাবে না।’

বিএনপির কয়েকজন নেতা ধারণা দিয়েছেন, গণভোট এবং সেই ভোটের রায় বৈধ কিংবা অবৈধ- সেই আলোচনায় তারা যেতে আগ্রহী নয়। বরং তাদের লক্ষ্য হলো, যেসব বিষয়ে দলগুলো একমত হয়েছিল এবং বিএনপি তার নির্বাচনী ইশতেহারে যা বলেছিল তার ভিত্তিতে সামনে সংবিধানে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনা।

গণভোট অধ্যাদেশটি যখন জারি হয় তখন সেখানে বলা হয়েছিল, জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ অনুসারে সংবিধান সংস্কার সম্পর্কিত কয়েকটি প্রস্তাবের বিষয়ে জনগণের সম্মতি রয়েছে কি না, তা যাচাইয়ে গণভোটের বিধান প্রণয়নকল্পে প্রণীত এ অধ্যাদেশ।

সে কারণে অনেকের মধ্যে এই প্রশ্ন আসছে যে, গণভোট অধ্যাদেশ সংসদে অনুমোদিত না হলে এর অধীনে হওয়া গণভোট এবং সেই ভোটের ফল বাতিল হয়ে যাবে কি না।

অধ্যাদেশগুলো পর্যালোচনার জন্য গঠিত বিশেষ কমিটির বৈঠক শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘গণভোট আয়োজনে একটি অধ্যাদেশ করা হয়েছিল। গণভোট হয়েছে। এই অধ্যাদেশের ব্যবহার হয়েছে। এর কোনো বিরোধিতা নেই। এই অধ্যাদেশকে সংসদে ধারণ করে ভবিষ্যতে ব্যবহার করার আর কিছু নেই।’

বিশ্লেষকরা অবশ্য বলছেন, ভোটের ফল সরকারি দল বাস্তবায়ন না করলে সেটি এমনিই অকার্যকর হয়ে যায় এবং সে কারণে অধ্যাদেশ অনুমোদিত না হলে ভোটের ফল কী হলো তার কোনো গুরুত্ব থাকে না।

আবার অনেকে মনে করেন, সরকারের একটি আইন বা অধ্যাদেশের আওতায় এর মধ্যেই সম্পন্ন হয়ে যাওয়া কোনো রায় বা জনমতের বৈধতা অকার্যকর হয়ে যায় না। ফলে সরকার বাস্তবায়ন না করলেও এর একটি আইনি ভিত্তি থেকেই যাবে।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও বাংলাদেশ রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের সভাপতি হাসনাত কাইয়ুম বলছেন, বিএনপি জাতীয় সনদের স্বাক্ষর করেছে এবং নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণ ম্যান্ডেট দিয়েছে।

তিনি বলেন, ‘বিএনপি এখন মনে করছে দুটি নির্বাচনের একটির মূল্য নেই। সেজন্য তারা সংবিধান সংশোধনের কথা বলছে। কিন্তু এটা সংশোধনের অযোগ্য। সংস্কার মানে সংশোধনী না। সংস্কার না হলে ভবিষ্যতে এটি বড় সংকটের জন্ম দেবে।’

উল্লেখ্য, জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সভায় রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ৩০টি বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছিল। আর সংবিধান সংস্কারে ৪৮টি প্রস্তাব নিয়ে গণভোটটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ভোটের ব্যালটে চারটি প্রশ্ন করে তাতে ভোটারদের সামনে ‘হ্যাঁ’ ও ‘না’ -তে ভোট দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছিল।

ঐকমত্য কমিশনের সদস্য হিসেবে কাজ করেছেন বদিউল আলম মজুমদার। তিনি বলেন, গণভোটে মানুষ সংস্কারের পক্ষে মত দিয়েছে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার মাধ্যমে।

তিনি বলেন, ‘গণভোট সংবিধানের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। এখন যা হচ্ছে সেটি হলো জনরায় উপেক্ষা করা। এর ফলে স্বৈরাচারী ব্যবস্থা ফিরে আসতে পারে এবং এর মাধ্যমে আমরা মানুষের আত্মত্যাগ অস্বীকার করছি, যা গ্রহণযোগ্য নয়।’

সূত্র : বিবিসি