সরিয়ে নেওয়া হলো খানজাহান আলীর মাজারের কুমির

লেখক: নিউজ আউটলুক ডেস্ক
প্রকাশ: ১ সপ্তাহ আগে

জনস্বার্থে বাগেরহাটের হযরত খানজাহান আলী (রহ.) মাজারের প্রায় ৬০০ বছর পুরোনো দিঘিতে বর্তমানে থাকা একমাত্র কুমিরটিকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। দিঘিতে কুমিরের আক্রমণে ৮ বছর বয়সী এক শিশুর নিহত হবার পর জরুরি সভা করে জেলা প্রশাসন এই সিদ্ধান্ত নেয়।

বুধবার (৩ জুন) দুপুরে সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বন বিভাগের বিশেষজ্ঞ টিম দিঘি থেকে কুমিরটি উদ্ধার করে খুলনা বন্যপ্রাণী ও পূর্নবাসনকেন্দ্রে নিয়ে গেছে। কুমিরটিকে সেখানে রাখা হবে। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শে মাজারের দিঘিতে কুমিরের জন্য সুরক্ষিত স্থাপনা নির্মাণ করে কুমিরটিকে ভবিষ্যতে ফিরিয়ে আনা হতে পারে জানানো হয়েছে।

গতকাল মঙ্গলবার রাতে বাগেরহাট জেলা প্রশাসকের সম্মেলনকক্ষে খান জাহান আলীর মাজারের সার্বিক নিরাপত্তা ও মাজার ব্যবস্থাপনা বিষয়ে এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী দিঘি থেকে কুমিরটি সরিয়ে নেওয়া হলো। বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক ও মাজার পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি গোলাম মো. বাতেন ওই সভায় সভাপতিত্ব করেন।

দিঘি থেকে সরিয়ে নেওয়া কুমিরটি নারী কুমির। তার আনুমানিক বয়স ৪৫ বছর। কুমিরটির ওজন ৬০০ কেজি, দৈর্ঘ ৯ ফুট ৩ ইঞ্চি এবং কুমিরের বেড় সাড়ে ৫ ফুট বলে সুন্দরবন বিভাগ জানিয়েছে।

গত সোমবার রাত ৮টার দিকে ফাতেমা আক্তার নামে (৮) একটি শিশু মাজারে দিঘির নারীদের জন্য নির্ধারিত ঘাটে গোসল করতে নামে। সে সময় কুমিরটি তাকে টেনে নিয়ে যায়। পরে স্থানীয়রা তল্লাশি চালিয়ে গতকাল ভোরে ভাসমান অবস্থায় দিঘি থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করেন।

এরপর মানুষের নিরাপত্তার বিষয় নিয়ে গতকাল রাতে জেলা প্রশাসক জরুরি সভা আহ্বান করেন। ওই সভা থেকে মানুষের নিরপত্তার বিষয়টি বিবেচনায নিয়ে দিঘি থেকে কুমিরটিকে সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়।

গোলাম মো. বাতেন জানান, সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী দিঘি থেকে কুমিরটিকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শক্রমে দিঘিতে কুমিরের জন্য সুরক্ষিত স্থাপনা নির্মাণ করে কুমিরটিকে ভবিষ্যতে ফিরিয়ে আনা হতে পারে।

তিনি আরও জানান, মাজারে আসা অনেক পর্যটকের কুমির দর্শনের আগ্রহ থাকে। তারপরও নিরাপত্তার জন্য কুমিরটিকে দিঘি থেকে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে মাজারের খাদেম ফকির তারিকুল ইসলাম জানান, এই মুহুর্তে দিঘি থেকে কুমিরটি সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত ঠিক হয়নি। আরও চিন্তাভাবনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত ছিল।

সুন্দরবন পূর্ব বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. রেজাউল করিম চৌধুরী জানান, জেলা প্রশাসনের সভার সিদ্ধান্ত অনুয়ায়ী দিঘি থেকে কুমিরটিকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। খুলনা বন্যপ্রাণী পূর্নবাসন কেন্দ্রের বিশেষজ্ঞ টিম আজ (বুধবার) দুপুরে মাজারে দিঘির পূর্বপাড় থেকে কুমিরটিকে উদ্ধার করে পিকআপ যোগে খুলনায় নিয়ে গেছে। সেখানে বন্যপ্রাণী পূর্নবাসন কেন্দ্রে কুমিরটি রাখা হয়েছে। ভবিষ্যতে দিঘিতে কুমিরের জন্য সুরক্ষিত স্থাপনা নির্মাণ করে কুমিরটিকে মাজারের দিঘিতে ফিরিয়ে আনা হতে পারে। ততদিন কুমিরটিকে খুলনায় রাখা হবে। কুমিরটি সুস্থ্য রয়েছে বলেও জানান ডিএফও।

জানা গেছে, ২০১৫ সালে ঐতিহ্যবাহী এই দিঘির কুমির ‘কালাপাড় ও ধলাপাড়ের’ শেষ বংশধরও মারা যায়। শত শত বছর ধরে দেশি-বিদেশি পর্যটকের আকৃষ্ট করে ছিল দিঘির মিষ্টি পানির ওই কুমির। ‘কালাপাড় ও ধলাপাড়’ নাম যেন ওই জুটির ছানাদের উদ্বেলিত করে রেখেছিল। তাই মাজারের খাদেমরাও যুগ যুগ ধরে কালাপাড় ও ধলাপাড় নামে ডাকলেই ওই জুটির বংশধররা দিঘির একপ্রান্ত থেকে ছুটে ঘাটে এসে ভিড় করত। মাজারের আসা দেশি-বিদেশি পর্যটক ও দর্শনার্থীরা কুমির স্পর্শ করে নিজেদের সার্থক মনে করতেন। অনেকেই আবার তাদের মনবাসনা পূর্ণ হওয়ায় নিজে হাতে কুমিরকে হাঁস-মুরগি খাওয়াতেন।

২০০৫ সাল থেকে এই দিঘিতে দুটি কুমির ছিল। এদের মধ্যে নারী প্রজাতির কুমিরটি বেশ কয়েক বছর ধরে ডিম দিলেও তা থেকে ছানা ফুটেনি। ওই কুমির জুটির মধ্যে একটি কুমির ২০২৩ সালের অক্টোবর মাসে মারা যায়। সেই থেকে দিঘিতে একটিমাত্র কুমির রয়েছে।

সুন্দরবন বিভাগ জানায়, কুমিরের প্রজনন বাড়াতে ভারত সরকার মাদ্রাজ ক্রোকোডাইল ব্যাংক থেকে ২০০৫ সালে বাংলাদেশকে ৪০টি কুমির ছানা উপহার দেয়। এর মধ্যে ছয়টি কুমিরের ছানা খান জাহান আলীর মাজারের দিঘিতে এবং পাঁচটি ঢাকা চিড়িয়াখানায় ও ২৯টি ডুলহাজরা সাফারি পার্কে অবমুক্ত করা হয়। ভারত সরকারের দেওয়া মিষ্টি পানির কুমিরের মধ্যে মাজারের ওই দিঘিতে সব শেষ দুটি ছিল। পুরুষ প্রজাতির কুমিরটি মারা যাওয়ায় এখন মাত্র নারী প্রজাতির একটি কুমির রয়েছে।

ইতিহাস থেকে জানা যায়, হজরত খানজাহান আলী (রহ.) সুলতানি শাসন আমলে খ্রিষ্টীয় ১৪ শতকের প্রথমদিকে এ অঞ্চলে আসেন। এরপর বাগেরহাটে খলিফাতবাদ নগর প্রতিষ্ঠা করেন তিনি। তার জীবনের তিনটি প্রকৃতি: তিনি চরিত্রে ধার্মিক, জনহিতৈষী তার ধর্ম এবং শাসন ও ধর্ম বিস্তার তার উদ্দেশ্য ছিল। তার ধর্ম, হিতৈষী কর্মকাণ্ড ও শাসন বিস্তার একসঙ্গে চলত। খান জাহান আলী অসংখ্য জলাশয় খনন করে স্থানীয়দের জলকষ্ট দূর করেন। যাতায়াতের জন্য সুপ্রশস্ত এবং ছায়াবহুল সড়ক র্নিমাণ করেছেন। নানা উপায় অবলম্বন করে কৃষিকার্যের উন্নতিসাধন করেন তিনি।

এ সময় তিনি ঠাকুর দিঘি নামে পরিচিত ৩৬০ বিঘা জমির ওপর বিশাল এ দিঘি খনন করেন। দিঘিটির দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ প্রায় সমান। সেখানেই তিনি ‘কালাপাড়’ ও ‘ধলাপাড়’ নামে দুটি কুমির লালনপালন করতেন।

দিঘির উত্তর পাড়ে রয়েছে খান জাহান আলীর মাজার। মাজার ও দিঘিকে ঘিরে প্রতিবছর দূরদূরান্ত থেকে জাতি ধর্ম নির্বিশেষে হাজার হাজার নারী-পুরুষ এখানে আসেন। অনেকে আবার তাদের মনবাসনা পূর্ণ করার আসায় এখানে মানত করেন। পরে তাদের মনবাসনা পূর্ণ হলে এখানে হাঁস-মুরগী, ছাগল উপহার দেন।

দিঘিতে থাকা ‘কালাপাড় ও ধলাপাড়’-এর শেষ বংশধর ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে মারা গেছে। খান জাহান আলীর ঐতিহাসিক ওই দিঘিটি বাগেরহাট সদর উপজেলার ষাটগুম্বজ ইউনিয়নে অবস্থিত।

  • কালা পাহাড়
  • কুমির
  • খানজাহান আলীর মাজার
  • খুলনা
  • বাংলাদেশ