‘প্রথম মুসলিম নার্স এবং ইসলামি শিক্ষার পথিকৃৎ রুফাইদাহ আল-ইসলামিয়ার মূল্যায়ন’ শীর্ষক ওই গবেষণায় দেখা গেছে যে, সাদ আল-আসলামি নামে একজন চিকিৎসক ও সার্জনের কন্যা রুফাইদাহ তার বাবার সহকারী হিসেবে চিকিৎসা ও অস্ত্রোপচারে ব্যবহারিক দক্ষতা অর্জন করেছিলেন।
‘ইসলামে হাসপাতালের ইতিহাস’ অনুসারে, রুফাইদার এই চিকিৎসা কেন্দ্রটিই ছিল ইসলামের প্রথম ‘হাসপাতাল’ বা ভ্রাম্যমাণ চিকিৎসা সেবা ইউনিট, যা প্রয়োজনে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে স্থানান্তরিত করা যেত।
ঐতিহাসিকদের মতে, এখানে অসুস্থ ও আহতদের চিকিৎসার জন্য ব্যান্ডেজ, ওষুধ, ভেষজ এবং তুলার বন্দোবস্ত ছিল। অভাবগ্রস্ত রোগীদের সেবা করার দায়িত্ব রুফাইদা নিজেই গ্রহণ করেছিলেন।
তার চিকিৎসা সেবার মধ্যে ছিল প্রাথমিক চিকিৎসা, জরুরি চিকিৎসা, গুরুতর আহতদের যত্ন, যুদ্ধক্ষেত্রে আহতদের পৃথকীকরণ, পুনর্বাসন এবং দীর্ঘমেয়াদী যত্ন।
পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং স্বাস্থ্যবিধির বিষয়টি বিবেচনায় রেখে, এমনভাবে চিকিৎসাকেন্দ্রটি স্থাপন করা হয়েছিল, যেখানে রোগীরা কঠোর মরুভূমির আবহাওয়ায় থেকেও ছায়া ও পরিষ্কার পানীয় জল পেত।
একজন দয়ালু এবং মমতাময়ী নার্স ছিলেন রুফাইদাহ, যিনি যুদ্ধের সময় একজন অত্যন্ত কার্যকর সংগঠক হিসেবেও আবির্ভূত হয়েছিলেন।
প্রথম নার্সিং স্কুল
রুফাইদা আল-ইসলামিয়া নিজেকে একজন ক্ষমতাবান ও দূরদর্শী নারী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। স্বেচ্ছাসেবী নার্স হিসেবে প্রশিক্ষণ দেওয়ার মাধ্যমে অন্য নারীদেরও ক্ষমতায়িত করেছিলেন তিনি।
‘অ্যাপ্রেইজিং রুফাইদাহ আল-ইসলামিয়া’ শীর্ষক গবেষণা অনুসারে, নিজের বাবার সাথে সহকারী হিসেবে কাজ করার সময় যে জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা অর্জন করেছিলেন, তার উপর ভিত্তি করেই, নারী স্বেচ্ছাসেবকদের জন্য ব্যবহারিক চিকিৎসা প্রশিক্ষণ কর্মসূচি শুরু করেছিলেন রুফাইদাহ।
প্রয়োজনীয় নার্সিং দক্ষতা শেখানোর মাধ্যমে স্বেচ্ছাসেবক নার্সদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস জাগিয়ে তুলেছিলেন তিনি।
এছাড়া রোগীদের যত্ন নেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জামও নার্সদের মধ্যে সরবরাহ করেছিলেন রুফাইদা আল-ইসলামিয়া। যা পরবর্তীতে ‘প্রথম আনুষ্ঠানিক নার্সিং প্রশিক্ষণ’ হিসেবেও প্রতিষ্ঠা পায়।
‘৬২২ খ্রিস্টাব্দে প্রথম আনুষ্ঠানিক নার্সিং স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন রুফাইদা আল-ইসলামিয়া। যেখানে, ইসলামের নবী এবং তার সাহাবীদের কয়েকজনের স্ত্রীকে সেবিকা হিসেবে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছিল, যাতে তারা যুদ্ধের (৬২৩-৬৩০ খ্রিস্টাব্দ) সময় মুসলিম বাহিনীকে সহায়তা করতে পারেন।’
‘নিজের কার্যকর যোগাযোগ দক্ষতার জন্যও পরিচিত ছিলেন রুফাইদা আল-ইসলামিয়া। বাবার মেডিকেল সহকারী হিসেবে সাথে কাজ করার সময় এ দক্ষতা অর্জন করেছিলেন তিনি। যে অভিজ্ঞতা তাকে একটি ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি তৈরিতেও সহায়তা করেছিল।’
গবেষণায় দেখা গেছে, তিনি চিকিৎসা-পরবর্তী মূল্যায়ন এবং রোগীদের অবস্থার ক্রমাগত পর্যবেক্ষণের উপরও গুরুত্ব দিয়েছিলেন। যাতে চিকিৎসা সঠিকভাবে চলতে পারে এবং রোগীরা দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠেন।
‘শ্রদ্ধা, সততা, সত্যবাদিতা এবং আন্তরিকতার মতো গুণাবলী দিয়ে তার যোগাযোগ দক্ষতার কার্যকরিতা নির্ধারণ করা হয়। যার ভিত্তিতে, স্বেচ্ছাসেবক নার্সদের জন্য পেশাদার আচরণের নীতি নির্ধারণ করেছিলেন তিনি।’
ইসলামের নবীর অনুমতিক্রমে, এই নারীরা যুদ্ধের সময় সেনাবাহিনীর আহত সৈন্যদের সেবা করতেন।
ইতিহাস অনুসারে, নবী মোহাম্মদ সা: রুফাইদার কার্যকর চিকিৎসা সেবায় এতটাই মুগ্ধ হয়েছিলেন যে, তিনি কিছু আহত সাহাবীকে সরাসরি তার কাছে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন, বিশেষ করে বদর, উহুদ, খন্দক এবং খায়বারের যুদ্ধের সময়।
মুহাদ্দিস মুহাম্মদ ইসমাইল বুখারী, যিনি ইমাম বুখারী নামে পরিচিত, তার ‘আল-আদাব আল-মুফরাদ’ এবং ইবনে সা’দ ‘আল-তাবাকাত’ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন যে, খন্দকের যুদ্ধের দিন যখন সা’দ বিন মুয়ায গুরুতর আহত হন, তখন তাকে রুফাইদা নামক এক মহিলার কাছে স্থানান্তর করা হয়, যিনি আহতদের চিকিৎসা করতেন।
এই নার্সদের চিকিৎসা সেবা দেখে নবী সা: এতটাই মুগ্ধ হয়েছিলেন যে, তিনি তাদেরকে যুদ্ধরত সৈন্যদের সমান গনীমতের মাল দিয়েছিলেন। ওয়াকিদী ও ইবনে আব্দুল বার এ বিষয়টি উল্লেখ করেছেন।
গবেষণায় দেখা গেছে, স্বাভাবিক সময়েও রুফাইদা আল-ইসলামিয়া অল্পবয়সী মেয়ে এবং মহিলাদের শিক্ষার প্রতি বিশেষ মনোযোগ দিতেন এবং রোগ নিয়ে সামাজিক কুসংস্কার সমাধানে কার্যকর ভূমিকা রাখতেন।
‘বিশেষ করে শিশু, এতিম, প্রতিবন্ধী এবং দরিদ্র ব্যক্তিদের সেবা করতেন তিনি। এটি নবীর নির্দেশনার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ ছিল, যেখানে নারীদের অব্যাহত শিক্ষার প্রচারের উপর জোর দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে, তিনি এই প্রশিক্ষিত নারীদেরকে নার্স হিসেবে তালিকাভুক্ত করেন।’
কমিউনিটি কেয়ার
রুফাইদা আল-ইসলামিয়া স্বাভাবিক সময়েও বিভিন্ন জায়াগায় রোগীদের সেবা প্রদান করেছেন এবং রোগীদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগের মাধ্যমে তাদের পুরোপুরি সুস্থ করে তোলার চেষ্টা ছিল তার।
ঐতিহাসিক বিবরণ অনুসারে, মদিনায় তিনিই প্রথম ব্যক্তি যিনি ভ্রাম্যমাণ ব্যবস্থায় সাধারণ মানুষের কাছে চিকিৎসা সেবা পৌঁছে দিয়েছেন।
ভ্রাম্যমাণ দলগুলো স্থানীয় জনগণের স্বাস্থ্যের চাহিদা অনুসারে সেবা দিত। এমনকি মরুভূমিতে তীব্র তাপে অজ্ঞান হয়ে পড়া ব্যক্তিদেরও সেবা করতেন তিনি।
মুহাম্মদ নিহালের গবেষণা থেকে জানা যায়, রুফাইদা আল-ইসলামিয়া বিশ্বের প্রথম প্যালিয়েটিভ কেয়ার ব্যবস্থাও শুরু করেছিলেন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, প্যালিয়েটিভ কেয়ার হলো দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত রোগীদের শারীরিক কষ্ট কমানো ও জীবনের শেষ সময়ে আরাম ও মানসিক সমর্থন দেওয়ার যে বিশেষ চিকিৎসা ব্যবস্থা।
গাউস সিওয়ানি লিখেছেন, রুফাইদা আল-ইসলামিয়া ইসলামের ইতিহাসে প্রথম মহিলা ডাক্তার, নার্স এবং সার্জন হিসেবে পরিচিত।
নিজের সম্পত্তি চিকিৎসার কল্যাণে ব্যবহার এবং ইতিহাসে প্রথম ‘বিনামূল্যের হাসপাতাল’ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তিনি। বদরের যুদ্ধের পর, ঘর ও অর্থ না থাকা আহত অনেক ব্যক্তি যারা বিনামূল্যে চিকিৎসা চেয়েছিলেন, তাদেরকে সুস্থ করে তুলেছিলেন রুফাইদা।
‘রুফাইদা তার সহকারীদের সাথে নিয়ে কেবল রোগীদের চিকিৎসাই করতেন না, তাদের জন্য খাবারও তৈরি করতেন। পরবর্তী অনেক যুদ্ধে, যুদ্ধক্ষেত্রের কাছেই তিনি নিজের তাঁবু স্থাপন করেছিলেন এবং আহতদের চিকিৎসা করেছিলেন।’
সৌদি আরবের প্রথম পিএইচডি নার্স, ড. সুয়াদ হুসেন, ১৯৮১ সালে রুফাইদা আল-ইসলামিয়ার উপর তার গবেষণা প্রকাশ করেন, যা আধুনিক যুগেও তার কাজ সম্পর্কে ধারণা দেয়।
সুয়াদ হুসেন লিখেছেন, নার্সিংয়ের উন্নতির জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন রুফাইদা।
উন্নত নার্সিংয়ের ভিত্তি হিসেবে নতুন নীতি এবং ঐতিহ্য প্রতিষ্ঠা করতে সফল হয়েছিলেন তিনি।
পাকিস্তান ও ভারত সহ বিশ্বের বহু দেশে রুফাইদাহ আল-ইসলামিয়ার নামে নার্সিং এবং সাধারণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নামকরণ করা হয়েছে।
একইভাবে, প্রতি বছর বাহরাইনের আরসিএসআই বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে উচ্চমানের নার্সিং সেবা প্রদানকারী শিক্ষার্থীদের রুফাইদাহ আল-ইসলামিয়া পুরষ্কার প্রদান করা হয়।
সূত্র : বিবিসি