বাংলাদেশকে সকল প্রাণী ও প্রাণের জন্য নিরাপদ আবাসস্থলে গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, বৃক্ষরোপণ কেবল বনায়নের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না; এমন একটি বাস্তুতন্ত্র গড়ে তুলতে হবে, যেখানে মানুষ, পশুপাখি, কীটপতঙ্গ, গাছপালা, মাটি, পানি ও বায়ু স্বাভাবিকভাবে সহাবস্থান করতে পারে।
তিনি বলেছেন, ‘আমি যে কথাটি মনে করি, সেই কথাটি আপনাদের সামনে বলতে চাইছি; সেটা হলো—দেশ হোক সকল প্রাণী এবং প্রাণের নিরাপদ আবাসস্থল।’
বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) সকালে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলনকেন্দ্রে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে বিশ্ব পরিবেশ দিবস, পরিবেশ মেলা, জাতীয় বৃক্ষরোপণ অভিযান ও বৃক্ষমেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।
এবারের জাতীয় বৃক্ষরোপণ অভিযান ও বৃক্ষমেলার প্রতিপাদ্য ‘বৃক্ষ রোপণে সাজাই দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, পরিবেশ মেলা ও বৃক্ষমেলার আয়োজন বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুস্থ ও সুন্দরভাবে বেড়ে ওঠার জন্য একটি নিরাপদ বিনিয়োগ। তবে এ আয়োজন কেবল বার্ষিক আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না।
তিনি বলেন, বৃক্ষরোপণ এবং পরিবেশ সংরক্ষণের মত এই যে বিষয়টা, এটা আমাদের একটা নৈমিত্তিক অভ্যাসে যদি আমরা পরিণত করতে পারি; তাহলে আমরা সকলের বক্তব্যে যে কথাগুলো বলি যে, একটা স্বাস্থ্যকর বসতি গড়ে তোলা দরকার, আমাদের গড়ে তোলা উচিত—এসবগুলো তাহলে ধীরে ধীরে আসলেই বাস্তবে রূপ নিতে পারবে।
দেশজুড়ে পরিবেশকর্মী, বৃক্ষরোপণ ও বাগান তৈরির সঙ্গে যুক্ত মানুষ এবং প্রতিশ্রুতিশীল তরুণদের প্রশংসা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তাদের মতো মানুষের সংখ্যা বাড়লে বাংলাদেশে একটি সবুজ বসতি গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
সবুজ বসতি গড়ে তুলতে সন্তান জন্মের সঙ্গে সঙ্গে একটি করে গাছ লাগানোর আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বৃক্ষরোপণ কিংবা সবুজের গুরুত্ব সম্পর্কে আমরা কমবেশি সবাই অবগত আছি। আমরা যখন ছোট ছিলাম, তখন ঢাকা শহরকে যত সবুজ দেখতাম, এখন বোধহয় দেখি না। এটার সঙ্গে নিশ্চয়ই আপনারা এই ঘরে উপস্থিত কেউ আমার সঙ্গে দ্বিমত করবেন না, সবাই নিশ্চয়ই আপনারা একমত হবেন।
তিনি বলেন, একটি সন্তান পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করলে আসুন, আমরা একটি করে গাছ লাগানোর মধ্য দিয়ে প্রতিটি প্রাণের জন্মকে উদযাপন করি, স্মরণীয় করে রাখি। একজন নবজাতকের পাশাপাশি একটি গাছও বেড়ে উঠুক। এভাবেই এগিয়ে যাক সবুজায়নের সামাজিক আন্দোলন”
যুক্তরাজ্যে অবস্থানকালের একটি অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, আমি লন্ডনে যে পাড়াটায় থাকতাম, আমার তিন-চারটি বাসা পরে একটা বাসা ছিল; তিনতলা বাসা। সেই বাসার সামনে দুটি গোলাপ গাছ ছিল দরজার দুপাশে।
তিনি বলেন, গোলাপ গাছগুলো বেড়ে বেড়ে প্রায় তিনতলা পর্যন্ত উঠে গিয়েছিল। একদিন বাসার মালিকের সঙ্গে আমার দেখা হলো। আমি বললাম যে তোমার এই গাছগুলো খুব সুন্দর। বেশি দূর থেকে খুবই সুন্দর লাগে দেখতে।
বাড়িটির মালিকের তিনটি সন্তান উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, তিনি বললেন, যখন আমার যেই সন্তান জন্ম হয়েছে, আমি তখন তার নামে একটি করে গাছ লাগিয়েছি। দুটো সামনে আছে, একটা বাসার পেছনে আছে। তিনটা গাছ এখন বড় হয়ে প্রায় তিনতলার সমান হয়ে গেছে। দেখতে খুবই সুন্দর লাগে।
তিনি বলেন, সেদিন থেকে আমার কাছে মনে হয়েছে যে, দেশে ফিরলে, আমার পক্ষে কখনও সুযোগ হলে এই কথাটি আমি বলার চেষ্টা করব। আমি সেজন্যই আজকে আপনাদের সামনে এই কথাগুলো আমি তুলে ধরলাম।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি গাছ রোপণের কর্মসূচি নিয়েছে। তবে পরিকল্পনা ছাড়া গাছ লাগালে এ লক্ষ্য পূরণ হলেও কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে না।
তিনি বলেন, আমি ব্যক্তিগতভাবে বিশ্বাস করি যে, কোন পরিবেশে, কী ধরনের মাটিতে, কী আবহাওয়ায় কোন প্রজাতির গাছ লাগানো উচিত, এটি সম্পর্কেও কমবেশি আমাদের একটি ধারণা থাকতে হবে এবং সেই বিষয়টিকে প্রাধান্য দিয়েই গাছগুলোকে আমাদের রোপণ করতে হবে।
তার কথায়, আমাদের পরিবেশের জন্য যে গাছগুলো ক্ষতিকারক, সেই গাছগুলোকে অবশ্যই পরিহার করা উচিত। সেই গাছগুলোকে আমাদের লাগাতে উৎসাহিত করা করা উচিত না এবং একই সঙ্গে নতুন বৃক্ষরোপণের ক্ষেত্রে দেশীয় প্রজাতির গাছ, যেমন: ঔষধি, অর্কিড, বাঁশজাতীয় বনজ, ফলদ, অর্থকরী ও বিপন্ন প্রজাতির গাছ রোপণ করা খুবই দরকার।
সরকারপ্রধান বলেন, বৃক্ষরোপণ বা বনায়নই শেষ কথা নয়। বনায়ন পশুপাখি, বিভিন্ন প্রাণী ও কীটপতঙ্গের জন্য নিরাপদ আবাসস্থল এবং প্রয়োজনীয় খাদ্যের জোগান দিতে পারছে কি না, সেটিও বিবেচনায় রাখতে হবে। কারণ আমরা অনেক গাছ কেটে ফেলার কারণে অনেক পোকামাকড় বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। সেটাও পরিবেশের জন্য ক্ষতিকারক।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বনায়নের মাধ্যমে গাছপালা, প্রাণী অর্থাৎ জীব এবং মাটি, পানি, বায়ু, পরিবেশ সবকিছু যাতে স্বাভাবিকভাবে মিলেমিশে থাকতে পারে, এমন একটি ইকোসিস্টেম বজায় রাখার চেষ্টা করছি আমরা। বর্তমান সরকার যে কাজগুলো করছে, তার ভেতর দিয়ে এই পুরো জিনিসটাকে একসঙ্গে রাখার পরিবেশ যেন ঠিকঠাক থাকে, সেটাই আমাদের লক্ষ্য।
তিনি আরও বলেন, শুধু যে গাছ লাগাব, শুধু যে প্লাস্টিক সরাব, তা নয়। অনেকগুলো ইন্টিগ্রেটেড (একীভূত) বিষয় আছে, সেগুলোকে আমরা খেয়াল রাখার চেষ্টা করছি। নতুন বৃক্ষরোপণ অবশ্যই জরুরি। তবে এই যে গাছটাকে আমরা রোপণ করলাম, এটা নিরাপদে বেড়ে উঠতে পারছে কি না, সেটি নিশ্চিত করাও খুব বেশি জরুরি।
সবুজায়নে সরকারের নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগ তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সবুজের সামাজিক আন্দোলনের পাশাপাশি পরিবেশ সংরক্ষণে সরকারিভাবে আমরা অনেকগুলো উদ্যোগ গ্রহণ করেছি। আমরা সরকার গঠন করার পরে প্রত্যেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গ্রিন ভলান্টিয়ারিজম চালু করার পদক্ষেপ নিয়েছি।
তিনি বলেন, কিছুদিন আগে আপনারা দেখেছেন, পত্রপত্রিকায় স্কুলগুলোর নিউজ এসেছে। একসঙ্গে স্কুলের একটা প্রোগ্রাম ছিল, একসঙ্গে প্রায় ৯০ হাজারের মতো গাছ বিভিন্ন স্কুলে সেদিন রোপণ করা হয়েছে।
তিনি আরো বলেন, একই সঙ্গে ক্লাইমেট ইয়ুথ ফেলোশিপ চালু এবং এনভায়রনমেন্ট স্টার্টআপ ফান্ডসহ বেশ কিছু উদ্যোগ আমরা গ্রহণ করেছি। সরকারের এই উদ্যোগগুলো যদি আমরা সফলভাবে বাস্তবায়ন করতে পারি, তাহলে অবশ্যই বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আমরা একটি নিরাপদ, স্বাস্থ্যকর এবং সবুজ বাংলাদেশ গঠন করতে সক্ষম হব ইনশাল্লাহ।
