ফানদুকমিয়া গ্রামে বাড়িঘর পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে

অধিকৃত পশ্চিম তীরের ফিলিস্তিনি গ্রামগুলোতে উগ্রপন্থী ইহুদি বসতি স্থাপনকারীরা একের পর এক হামলা চালাচ্ছে। ঘরবাড়ি, যানবাহন এবং ফসলি জমিতেও আগুন ধরিয়ে দিচ্ছে তারা।
শনিবার ১৮ বছর বয়সী ইহুদি তরুণ- ইহুদা শেরম্যানের মৃত্যুর পর এই সহিংসতার সূত্রপাত হয়।
জানা গেছে, কোয়াড বাইক চালানোর সময় এক ফিলিস্তিনির গাড়ির ধাক্কায় তার মৃত্যু হয়। পুলিশ জানিয়েছে, এই ঘটনাটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ছিল নাকি দুর্ঘটনা, তা তারা তদন্ত করছে।
এর প্রতিক্রিয়ায়, বসতি স্থাপনকারীদের ব্যবহৃত হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপগুলোতে ‘প্রতিশোধ অভিযানের’ ডাক দেয়া হয়।
ইসরাইলি সংবাদমাধ্যমে একজন প্রতিরক্ষা কর্মকর্তার বরাত দিয়ে বলা হয়, রাতারাতি ২০টিরও বেশি হামলার খবর পাওয়া গেছে।
জাতিসঙ্ঘের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের ইরানে আক্রমণের পর থেকে ফিলিস্তিনে বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
গত ১ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত বসতি স্থাপনকারীদের হাতে ছয় ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন।
ইসরাইল ডিফেন্স ফোর্সেস (আইডিএফ) এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, শনিবার রাতে বেশ কয়েকটি ফিলিস্তিনি গ্রামে তাদের সেনা ও সীমান্ত পুলিশ ইউনিট পাঠানো হয়েছে।
ফিলিস্তিনে তাদের অধিকৃত এলাকায় ইসরাইলের বেসামরিক নাগরিকরা ঘরবাড়ি ও সম্পত্তিতে অগ্নিসংযোগ এবং বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে, এমন খবর পাওয়ার পর তারা এই পদক্ষেপ নেয়।
হামলার শিকার গ্রামগুলোর মধ্যে রয়েছে জালুদ, কারিয়ুত, আল-ফান্দুকুমিয়াহ ও সিলাত আদ-দাহর।
অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া ফুটেজে দেখা গেছে, কালো পোশাক পরা এবং মাস্ক লাগানো ৯০ জনেরও বেশি লোক জালুদ গ্রামে ঢুকে দৌড়াচ্ছে।
অন্য একটি ভিডিওতে দেখা গেছে, গ্রামটিতে একাধিক যানবাহনে আগুন জ্বলছে, ভবনের জানালা ভাঙা এবং অ্যাম্বুলেন্স আসার সময় সাইরেনের শব্দ শোনা যাচ্ছে।
ফিলিস্তিনি রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি জানিয়েছে, জালুদে হামলাকারীদের প্রতিহত করতে গিয়ে অন্তত তিনজন ফিলিস্তিনি মাথায় আঘাত পেয়েছেন এবং তাদের হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। বেশ কিছু হামলাকারীও আহত হয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে।
ইসরাইলি সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, বসতি স্থাপনকারীদের একটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে লেখা হয়েছে, ‘ইহুদিদের রক্ত ঝরলে আমরা চুপ থাকব না।’ অন্য একটি বার্তায় বলা হয়েছে, ‘আমরা প্রতিশোধ এবং শত্রুদের নির্মূল করতে চাই।’
ফিলিস্তিনি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এসব হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেছে, ঈদুল ফিতরের মধ্যে চালানো এই হামলায় ‘ঘরবাড়ি ও সম্পত্তি পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে, বেসামরিক নাগরিকদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি ও হত্যা করা হয়েছে এবং গুরুত্বপূর্ণ রাস্তা ও সংযোগস্থলগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।’
ইসরাইলি পুলিশ রোববার জানিয়েছে, দেইর আল-হাতাব গ্রামের কাছ থেকে সীমান্ত রক্ষীরা পাঁচজনকে গ্রেফতার করেছে।
তারা আরো জানায়, ইতামার বসতির কাছে বেশ কিছু ইসরাইলি বেসামরিক বাসিন্দা নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর হামলা চালালে একজন পুলিশ কর্মকর্তা আহত হন।
পুলিশ জোর দিয়ে বলেছে, তারা ‘উগ্রপন্থী সহিংস ব্যক্তিদের প্রতি একটুও শিথীল থাকবে না।’
ফিলিস্তিনিদের অধিকার রক্ষায় কাজ করা ইসরাইলি মানবাধিকার সংস্থা ‘ইয়েশ দিন’ এই হামলাগুলোকে ‘এক রাতের তাণ্ডব’ হিসেবে বর্ণনা করেছে।
রোববার সন্ধ্যায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ দেয়া এক বিবৃতিতে তারা জানায়, ‘হামলার পরিকল্পনার কথা আগে থেকে জানা থাকা সত্ত্বেও বাহিনীগুলো আবারও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়েছে। এই তাণ্ডব ঠেকাতে কোনো প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।’
রোববার সন্ধ্যায় অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইহুদি বসতি স্থাপনকারীরা প্রতিবাদে রাস্তা অবরোধ করে রাখে।
অসমর্থিত সূত্রে জানা গেছে, বসতি স্থাপনকারী গোষ্ঠীগুলো আবারও ফিলিস্তিনি গ্রামগুলোর বাইরে জড়ো হতে শুরু করেছে।
স্থানীয় বার্তাসংস্থা ‘ওয়াফা’ জানিয়েছে, তারা নাবলুসের উত্তর-পশ্চিমে একটি কার ওয়াশ সেন্টারে (গাড়ি ধোয়ার জায়গা) আগুন ধরিয়ে দিয়েছে।
চলতি মাসের শুরুর দিকে ইইউ এবং যুক্তরাজ্য দাবি করেছিল, ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতার যে মাত্রায় বেড়েছে।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, বছরের শুরু থেকে এ পর্যন্ত ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীদের হাতে সাত জন এবং ইসরাইলি বাহিনীর হাতে ১৮ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে ১৫টি হত্যাকাণ্ডই ঘটেছে ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর।
১৯৬৭ সালের মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের পর থেকে ইসরাইল পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুসালেমে প্রায় ১৬০টি বসতি তৈরি করেছে, যেখানে প্রায় সাত লাখ ইহুদি বসবাস করে।
ফিলিস্তিনিরা গাজাসহ এই ভূখণ্ডকে তাদের ভবিষ্যৎ স্বাধীন রাষ্ট্রের অংশ হিসেবে দেখতে চায়। বর্তমানে এই এলাকায় প্রায় ৩৩ লাখ ফিলিস্তিনি বসবাস করেন।
আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী এই বসতিগুলো অবৈধ।
সূত্র : বিবিসি
