নুসরাত হত্যা মামলা: সিরাজসহ ২ জনের মৃত্যুদণ্ড বহাল, ৪ জনের আমৃত্যু কারাদণ্ড

লেখক: নিউজ আউটলুক ডেস্ক
প্রকাশ: ১ সপ্তাহ আগে

ফেনীর সোনাগাজীর বহুল আলোচিত মাদরাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলায় সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল (ডিগ্রি) মাদরাসার বরখাস্ত হওয়া অধ্যক্ষ এস এম সিরাজ উদদৌলাসহ দুই আসামির মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখেছেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে চার আসামিকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। খালাস পেয়েছেন ১০ আসামি।

সোমবার দুপুরে বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী ও বিচারপতি কে এম রাশেদুজ্জামান রাজার হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রায় ঘোষণা করেন।

মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকা অপর আসামি হলেন শাহাদাত হোসেন ওরফে শামীম।

আমৃত্যু কারাদণ্ড পাওয়া চার আসামি হলেন নূর উদ্দিন, সাইফুর রহমান মোহাম্মদ জোবায়ের, উম্মে সুলতানা ওরফে পপি এবং জাবেদ হোসেন ওরফে সাখাওয়াত হোসেন।

খালাস পেয়েছেন সোনাগাজীর সাবেক পৌর কাউন্সিলর মাকসুদ আলম, হাফেজ আব্দুল কাদের, আবছার উদ্দিন, কামরুন নাহার মনি, আব্দুর রহিম শরীফ, ইফতেখার উদ্দিন রানা, ইমরান হোসেন ওরফে মামুন, মোহাম্মদ শামীম, মাদরাসার গভর্নিং বডির তৎকালীন সহসভাপতি রুহুল আমীন ও মহিউদ্দিন শাকিল।

নিম্ন আদালতের রায়
২০১৯ সালের ২৪ অক্টোবর ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল এ মামলার রায় দেন। রায়ে মাদরাসার বরখাস্ত হওয়া অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলাসহ ১৬ আসামির প্রত্যেককে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। একই সঙ্গে প্রত্যেককে এক লাখ টাকা করে অর্থদণ্ড দেওয়া হয়।

পরে আসামিরা হাইকোর্টে আপিল করেন। মৃত্যুদণ্ড অনুমোদনের জন্য মামলার নথিও উচ্চ আদালতে পাঠানো হয়।

২০১৯ সালের ২৯ অক্টোবর আসামিদের মৃত্যুদণ্ড অনুমোদনের জন্য ডেথ রেফারেন্স হিসেবে মামলার সব নথি হাইকোর্টে পৌঁছায়। এরপর অগ্রাধিকার ভিত্তিতে মামলার পেপারবুক ছাপানোর কাজ শেষ করা হয়।প্রয়োজনীয় কার্যক্রম শেষে শুনানির জন্য মামলাটি প্রধান বিচারপতির কাছে উপস্থাপন করা হয়। পরে প্রধান বিচারপতি শুনানির জন্য হাইকোর্ট বেঞ্চ নির্ধারণ করেন।

ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী, বিচারিক আদালত কোনো আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দিলে সেই রায় অনুমোদনের জন্য মামলার নথি উচ্চ আদালতে পাঠাতে হয়। এ প্রক্রিয়ায় নুসরাত হত্যা মামলার ডেথ রেফারেন্স হাইকোর্টে আসে। এর পাশাপাশি আসামিরা জেল আপিল ও ফৌজদারি আপিল করেন।

যেভাবে হত্যা করা হয় নুসরাতকে

মামলার বিবরণ অনুযায়ী, ২০১৯ সালের ২৭ মার্চ নুসরাতকে যৌন নির্যাতনের অভিযোগে তার মা শিরীন আক্তার সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদরাসার অধ্যক্ষ সিরাজ-উদদৌলার বিরুদ্ধে মামলা করেন। পরে পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে।

অধ্যক্ষের অনুসারী কয়েকজন তার পক্ষে জনমত তৈরির চেষ্টা করেন। তারা সিরাজকে কারাগার থেকে বের করে আনার চেষ্টা করেন।

৩ এপ্রিল কারাগারে গিয়ে সিরাজের সঙ্গে দেখা করে তার অনুসারীরা। সেখানে নুসরাতকে হত্যার বিষয়ে পরামর্শ হয়। পরদিন ৪ এপ্রিল মাদরাসার ছাত্রাবাসে তাকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, ৬ এপ্রিল আলিম পরীক্ষা দিতে মাদরাসায় যান নুসরাত। সেখানে তাকে কৌশলে সাইক্লোন শেল্টারের ছাদে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর তাঁর গায়ে আগুন দিয়ে হত্যার চেষ্টা করা হয়।

ঘটনার পর নুসরাতকে উদ্ধার করে প্রথমে সোনাগাজী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। পরে তাকে ফেনী জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হয়। অবস্থার অবনতি হলে ঢাকার শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের তৎকালীন বার্ন ইউনিটে নেওয়া হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১০ এপ্রিল মারা যান নুসরাত।

এ ঘটনায় নুসরাতের ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান ৮ এপ্রিল মামলা করেন।

মামলার তদন্ত শেষে ২৮ মে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়। ২০ জুন অভিযোগ গঠন করেন ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল। এরপর সাক্ষ্য গ্রহণ ও যুক্তিতর্ক শেষ হলে ৩০ সেপ্টেম্বর আদালত ২৪ অক্টোবর রায়ের দিন ধার্য করেন।

মাত্র ৬১ কার্যদিবসে মামলাটিতে ৮৭ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ ও যুক্তিতর্ক গ্রহণ করা হয়।

নুসরাতের বাড়িতে নিরাপত্তা জোরদার
হাইকোর্টের রায় ঘোষণাকে কেন্দ্র করে নুসরাতের বাড়িতে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়।
রোববার বিকেলে পরিবারের নিরাপত্তা ও সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে সোনাগাজী মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আবুল হাসিমের নেতৃত্বে একদল পুলিশ নুসরাতের বাড়িতে যায়। এ সময় পুলিশ সদস্যরা পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেন এবং তাদের নিরাপত্তার বিষয়ে খোঁজ নেন।

নুসরাতের মা শিরিন আক্তার বলেন, একমাত্র মেয়েকে হারিয়ে তিনি এখনো পাগলের মতো অবস্থায় আছেন। নিম্ন আদালতে বিচার চেয়ে তারা ন্যায়বিচার পেয়েছেন। তবে এখনো তার তিন ছেলেকে নিয়ে নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা রয়েছে।

তিনি বলেন, পুলিশ তাদের নিরাপত্তা দিচ্ছে। বর্তমান সরকারের কাছেও ন্যায়বিচার প্রাপ্তিতে সহযোগিতা এবং পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রত্যাশা রয়েছে। উচ্চ আদালতেও তারা ন্যায়বিচার পাবেন বলে আশা করেন।

নুসরাতের বড় ভাই মো. নোমান বলেন, বাড়িতে তার মা ও পরিবারের অন্য সদস্যরা আছেন। বাড়তি নিরাপত্তা জোরদার করায় পুলিশ প্রশাসনের প্রতি তাঁরা কৃতজ্ঞ। তারাও ন্যায়বিচার চান।

সোনাগাজী মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আবুল হাসিম বলেন, ২০১৯ সালে নুসরাত হত্যা মামলার রায়ের পর থেকেই পরিবারের নিরাপত্তায় প্রতিদিন পুলিশের একটি দল নিয়োজিত ছিল। হাইকোর্টের রায়কে কেন্দ্র করে বাড়িতে আরো নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে।

  • আইন - আদালত
  • নুসরাত হত্যা মামলা
  • বাংলাদেশ