নির্বাচনের বড় সমস্যা এআই, কী করবে ইসি?

লেখক: নিউজ আউটলুক ডেস্ক
প্রকাশ: ২ মাস আগে

আসছে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনী প্রচারণায় এবার চোখে পড়ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর ব্যাপক ব্যবহার। এআই দিয়ে নির্মিত এসব কন্টেন্টে রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষে যেমন প্রচারণা চালানো হচ্ছে, তেমনি করা হচ্ছে প্রতিপক্ষকে আক্রমণও।

এআইয়ের ব্যাপক ব্যবহার শুরুর পর, বাংলাদেশে আয়োজিত হতে যাওয়া প্রথম নির্বাচনে এটি যে বড় একটি ফ্যাক্টর হতে যাচ্ছে, সে বিষয়ে আগেই সতর্ক করেছিলেন বিশেষজ্ঞরা।

বিষয়টি মাথায় রেখে নির্বাচনী আচরণবিধিতেও এ সংক্রান্ত নীতমালা অন্তর্ভুক্ত করেছিল নির্বাচন কমিশন।

তা সত্ত্বেও নির্বাচন এগিয়ে আসার সাথে সাথে এআই দিয়ে তৈরি করা আক্রমণাত্মক ভিডিওতে সামাজিক মাধ্যম সয়লাবের যে পরিস্থিতি বর্তমানে দেখা যাচ্ছে, অন্তর্বর্তী সরকারের তা সামাল দেওয়ার সামর্থ নিয়েও উঠছে প্রশ্ন।

একইসাথে জনসাধারণের মধ্যে এ বিষয়ে যথেষ্ট পরিমাণে সচেতনতা না থাকায় এসব ভিডিও দিয়ে বিভ্রান্ত এবং প্রভাবিত হওয়ার সুযোগ রয়েছে বলে মনে করছেন পর্বেক্ষকরা, প্রকাশ করছেন উদ্বেগও।

বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের স্ত্রী জুবাইদা রহমান সাহায্য পাঠাতে জনসাধারণের কাছে বিকাশ নম্বর চাইছেন- এআই দিয়ে তৈরি করা এমন একটি ভিডিও তাদের মেয়ে জাইমা রহমানের নামে খোলা ভুয়া ফেসবুক আইডি থেকে কয়েক সপ্তাহ আগে পোস্ট করা হয়।

সেই ভিডিওটি কেবল ফেসবুকেই দেখেছিল দুই মিলিয়ন বা ২০ লাখ সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারকারী। কেবল এই ভিডিওই না, এভাবে তৈরি করা এমন অসংখ্য ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে। হচ্ছে লাখ লাখ ভিউ।

কারণ এই নির্বাচনী মৌসুমে ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করা কারো চোখে ভিডিওগুলো না আসা বেশ কঠিন। নির্বাচনের প্রচারণার কৌশল হিসেবেই খুব পরিকল্পিতভাবে এসব কন্টেন্ট নির্মাণ করে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে।

আর সেখানে সামনে আসছে নির্বাচনের বড় দুই প্রতিদ্বন্দ্বী দল বিএনপি আর জামায়াতে ইসলামীর নাম।

১ জানুয়ারি থেকে ১৫ জানুয়ারি পর্যন্ত ১৫ দিনে বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে প্রকাশিত ৮০০টির বেশি এআই নির্মিত ভিডিও বিশ্লেষণ করেছে গবেষণা প্রতিষ্ঠান ডিসমিসল্যাব।

এতে দেখা গেছে, সরকারি ব্যক্তিত্বসহ নানা বয়স, শ্রেণি ও পেশার মানুষদের নিয়ে নির্মিত ভিডিওগুলোর বেশিরভাগই জামায়াতকে সমর্থন করে বানানো হয়েছে।

নির্বাচনী আচরবিধির ১৬(ছ) ধারায় বলা হয়েছে, ‘রাজনৈতিক দল, প্রার্থী বা প্রার্থীর পক্ষে অন্য কোনো ব্যক্তি, ভোটারদের বিভ্রান্ত করিবার জন্য কিংবা নারী-পুরুষ নির্বিশেষে কোনো প্রার্থী বা ব্যক্তির চরিত্র হনন কিংবা সুনাম নষ্ট করিবার উদ্দেশ্যে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বা অন্য কোনো মাধ্যমে, সাধারণভাবে বা সম্পাদন করিয়া কিংবা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দ্বারা কোনো মিথ্যা, বিভ্রান্তকর, পক্ষপাতমূলক, বিদ্বেষপূর্ণ, অশ্লীল বা কুরুচিপূর্ণ এবং মানহানিকর কোনো আধেয় তৈরি প্রকাশ, প্রচার ও শেয়ার করিতে পারিবেন না।’

ফলে আচরণবিধি অনুযায়ী এআই ভিডিও তৈরি করে প্রচার-প্রচারণায় কোনো বাধাও নেই। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, প্রচারণার জন্য বানানো এআই ভিডিও কেবল দলগুলোকে সমর্থনই না, করছে আক্রমণও যা আচরণবিধির লঙ্ঘন।

ডিজিটালই রাইটের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মিরাজ আহমেদ চৌধুরী জানান, এআই নির্মিত ভিডিওগুলোর মধ্যে নিখাদ প্রচারণামূলক থেকে শুরু করে বিদ্বেষমূলক, আক্রমণাত্মক, এমনকি ষড়যন্ত্রতাত্ত্বিক কন্টেন্টও আছে।

তিনি বলেন, ‘যে যার উদ্দেশ্য থেকে এই কন্টেন্টগুলো তৈরি করছে। কেউ নির্বাচনের পক্ষে তৈরি করছে, কেউ বিপক্ষে তৈরি করছে। কেউ দলের পক্ষে তৈরি করছে, কেউ বিপক্ষে তৈরি করছে।’

আর কোনো ধরনের স্বচ্ছতা ছাড়াই এলগরিদমও এগুলোকে ছড়িয়ে দেওয়ায় এসব ভিডিওতে সয়লাব সামাজিক মাধ্যম।

মিরাজ আহমেদ চৌধুরী বলেন, ‘এটা প্রযুক্তির কারণে সহজ হয়েছে এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতার কারণে ব্যাপক হয়েছে।’

পাল্টাপাল্টি দোষারোপ, কী করছে ইসি?

ডিসমিসল্যাবের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, জামায়াতের এজেন্ডা ছড়িয়ে দেওয়া ভিডিওগুলোতে বিএনপিকে চাঁদাবাজ এবং প্রতারক হিসেবে দেখানো হচ্ছে। অন্যদিকে বিএনপির সমর্থনে ছড়ানো এআই ভিডিওগুলোতে আসছে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় জামায়াতের বিতর্কিত ভূমিকার বিষয়টি।

এসব এআই কন্টেন্ট নিয়ে প্রধান দুই দল যেমন উদ্বেগ প্রকাশ করছে, তেমনি দোষারোপও করছে একে অন্যকে। একইসাথে অস্বীকার করছে নিজেদের সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি।

বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির মুখপাত্র ও দলের চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা মাহদী আমিন বলেন, ‘আমাদের প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে এটি সার্বজনীন অভিযোগ যে তারা বিভিন্ন ধরনের চরিত্র হননে লিপ্ত রয়েছেন।’

এদিকে, জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, অন্যায়-অসৎভাবে কিছু করলে তার পরিণামটা ভালো হয় না। দিনশেষে জনগণের কাছে আমাদের যেতে হবে এবং এ ধরনের মিথ্যাচার বা অপপ্রচার জনগণের কাছে একসময় স্পষ্ট হয়ে যাবে।’

পর্যবেক্ষকরা বলছেন, এআই ভিডিও তৈরি ও প্রচারের পেছনে রাজনৈতিক দলের সমর্থকদের সংশ্লিষ্টতা বেশি দেখা গেলেও, অর্থ উপার্জনের জন্যেও নির্বাচনী মৌসুমকে বেছে নিয়েছেন কেউ কেউ।

ফলে এআই দিয়ে ছড়িয়ে দেওয়া এমন ক্লিকবেইট খবর বিভ্রান্তি তৈরি করছে। কিন্তু এমন ক্ষতিকর এআই ভিডিওর বিরুদ্ধে নির্বাচন কমিশন কী ব্যবস্থা নিয়েছে?

নির্বাচন কমিশনের আইন শৃঙ্খলা সমন্বয় সেলের মুখ্য সমন্বয়ক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ আজিজুর রহমান সিদ্দিকী বলেন, ‘ইউএনডিপির সাথে আমরা একটা প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেছি, আচরণবিধির সাথে কাস্টমাইজ করে এটার সাথে এআইয়ের মাধ্যমে স্ক্যানিং ব্যবস্থা করা আছে।’

নিজেদের সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা শিকার করে নিয়ে তিনি বলেন, বেছে বেছে গুরুতর প্রকৃতির যেসব কন্টেন্ট আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে খারাপ করে রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে অস্থিতিশীল করতে পারে কেবল সেগুলোর বিরুদ্ধেই নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা বাহিনীর মাধ্যমে যাচাই-বাছাই করে সামাজিক মাধ্যমের প্ল্যাটফর্মগুলোতে পাঠানো হয়।

নিয়ন্ত্রণের সীমা নির্ধারণের সতর্কতা

এআই ভিডিওর মাধ্যমে কম খরচে অনেক ভিডিও তৈরি করার সুযোগ থাকায় অনেক প্রার্থীর জন্য এটি প্রচারণার ইতিবাচক মাধ্যম হয়ে উঠেছে। ফলে ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ তৈরি হচ্ছে বলেও মনে করছেন পর্যবেক্ষকদের অনেকে।

তবে যেকোনো এআই নির্মিত কন্টেন্টের ক্ষেত্রে লেবেলিং নিশ্চিত করার দিকটিতেই গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলছেন বিশ্লেষকরা, যাতে করে সাধারণ মানুষ বিভ্রান্ত না হন।

একইসাথে এআই কন্টেন্ট নিয়ন্ত্রণের সীমা নির্ধারণের ক্ষেত্রে সতর্কতার কথাও বলছেন মিরাজ আহমেদ। তার মতে, ক্ষতিকর কন্টেন্টকে নিয়ন্ত্রণ ‘করতেই হবে’। কিন্তু সেখানেও দক্ষতা দরকার।

অর্থাৎ কোন কন্টেন্ট ক্ষতিকর তা বুঝতে না পারলে সাধারণ সমালোচনাকেও কণ্ঠরোধ করা হতে পারে।

মিরাজ আহমেদ বলেন, ‘এই ক্যাপাসিটি ইলেকশন কমিশনের কতটুকু আছে আমার জানা নাই।’

সূত্র : বিবিসি