
নেপাল-চীন সীমান্তবর্তী হিমালয় অঞ্চলে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৫৫২ জনে দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যে নেপালে ৫৪৭ জন এবং চীনের তিব্বত অঞ্চলে পাঁচজন মারা গেছেন। এখনো নিখোঁজ রয়েছেন দেড় হাজারের বেশি মানুষ।
বুধবারের ভয়াবহ দুর্যোগের পর ধ্বংসস্তূপ ও কাদার নিচে চাপা পড়া লাশ উদ্ধারে শুক্রবারও অভিযান চালিয়ে যাচ্ছেন উদ্ধারকারীরা। এরই মধ্যে নতুন বিপদের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। উজানে তৈরি হওয়া একটি হ্রদ উপচে পড়ছে। এতে আবারও ভয়াবহ বন্যা হতে পারে বলে সতর্ক করেছে নেপাল ও চীনের কর্তৃপক্ষ।
শুক্রবার নেপালের জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ জানায়, বন্যায় এখন পর্যন্ত ৫৩৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। তবে দেশটির পুলিশ বলেছে, মৃতের সংখ্যা ৫৪৭। এর আগে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ৩৯০ জনের লাশ উদ্ধারের তথ্য জানানো হয়েছিল।
উজানে নতুন হ্রদ, ফের বন্যার শঙ্কা
বুধবারের দুর্যোগের পর উজানে একটি নতুন হ্রদ তৈরি হয়েছে। হ্রদটি ইতোমধ্যে উপচে পড়ছে। ফলে সেখান থেকে আবারও বড় ধরনের বন্যা নেমে আসার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
চীনের পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, হ্রদটিতে বর্তমানে প্রায় ২০ লাখ ঘনমিটার পানি রয়েছে। আগামী তিন দিনে সেখানে আরো প্রায় ৩০ লাখ ঘনমিটার পানি জমতে পারে।
চীনের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন সিসিটিভি শুক্রবার জানায়, নেপাল সীমান্তের গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশপথ গিরং বন্দরের প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে হ্রদটির প্রাকৃতিক বাঁধ রয়েছে। কাদা ও বন্যার পানিতে গিরং বন্দর ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
হ্রদটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ২ হাজার ৯৫০ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত। এটি গিরং বন্দরের চেয়ে প্রায় ১ হাজার মিটার উঁচুতে।
নতুন বন্যার ঝুঁকি বিবেচনায় নেপাল সেনাবাহিনী সীমান্ত এলাকায় একটি দল পাঠিয়েছে। দলটি ভোতেকোশি নদীর পরিস্থিতি পরিদর্শন করছে।
হেলিকপ্টারে উদ্ধার ৩ হাজার ২৫৩ জন
দুর্যোগের পর উদ্ধার তৎপরতা জোরদার করা হয়েছে।
নেপালের জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, হেলিকপ্টারে করে দুর্গত এলাকা থেকে ৩ হাজার ২৫৩ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে।
আহত ও ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের কাঠমান্ডুসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। নিখোঁজ ব্যক্তিদের মধ্যে বিভিন্ন দেশের নাগরিকও রয়েছেন। তাদের অনেকেই ট্রেকার ও তীর্থযাত্রী।
সীমান্তবর্তী আপার ত্রিশূলী-১ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের একটি টানেলে মানুষ আটকা পড়েছেন বলে খবর পাওয়া গেছে। তাদের উদ্ধারে শুক্রবার সেখানে একটি দল পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন নেপাল সেনাবাহিনীর মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল রাজা রাম বাসনেত।
তিনি বলেন, ‘সবকিছু কাদায় ঢেকে যাওয়ায় টানেলটির প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ খুঁজে বের করা জটিল হয়ে পড়েছে। আমাদের প্রথম অগ্রাধিকার হলো আটকে পড়া মানুষদের উদ্ধার করা।’
‘এটা বন্যা নয়, যেন সুনামি’
দুর্যোগের ভয়াবহতা সবচেয়ে বেশি বোঝা যাচ্ছে ক্ষতিগ্রস্ত জনপদগুলোর চিত্রে। বিভিন্ন ভিডিওতে দেখা গেছে, প্রবল স্রোতে ভবন, সেতু ও যানবাহন ভেসে যাচ্ছে। প্রাণ বাঁচাতে মানুষ দৌড়ে উঁচু জায়গায় উঠছে।
বন্যার পর বিস্তীর্ণ এলাকা ঘন কাদায় ঢেকে গেছে। ছড়িয়ে আছে ভাঙা কংক্রিটের স্তূপ। ভবন কাদায় চাপা পড়েছে। অনেক সড়কও মাটির নিচে চলে গেছে।
চীন সীমান্তের সবচেয়ে কাছের নেপালি গ্রাম টিমুরের বাসিন্দা ও শুল্ক কর্মকর্তা করবির গাইরে সেই ভয়াবহতার প্রত্যক্ষদর্শী।
বুধবার সকাল আটটার দিকে অফিসে বসে কম্পিউটারে কাজ করছিলেন তিনি। হঠাৎ ভূকম্পন অনুভব করেন। এরপর দেখেন, তাদের দিকে কালো এক প্রবল স্রোত ধেয়ে আসছে।
গাইরে বলেন, ‘কম্পন অনুভব করার পরপরই দেখলাম আমাদের দিকে একটি কালো ঝড় ধেয়ে আসছে। আমরা সবাই সঙ্গে সঙ্গে বাইরে দৌড়াতে শুরু করি এবং কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই অফিস ভবনের বিপরীত পাশের উঁচু জায়গায় উঠে যাই। আমার মনে হয়, ওই ১০ সেকেন্ডের মতো সময় আমাদের কয়েকজনের জীবন বাঁচিয়েছে।’
তার ১৫ সহকর্মী এখনো নিখোঁজ।
গাইরের ভাষায়, ‘এটা যেন হলিউডের কোনো সিনেমার দৃশ্য ছিল। আমি একে বন্যা বলব না, এটা ছিল সুনামি।’
একসময় সরকারি অফিস, হোটেল, ক্যাফে, ব্যাংক, প্রাথমিক বিদ্যালয়, চায়ের দোকান ও আবাসিক ভবনে প্রাণবন্ত ছিল টিমুর। সেখানে দেড় হাজারের বেশি মানুষ বসবাস করতেন।
স্বজনদের খোঁজে উৎকণ্ঠা
দুর্যোগের পর নেপাল ছাড়িয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে থাকা মানুষের মধ্যে উৎকণ্ঠা ছড়িয়ে পড়েছে। নিখোঁজ স্বজনদের সন্ধানে পরিবারগুলো যোগাযোগ করছেন নেপাল ও ভারতীয় কর্মকর্তাদের সঙ্গে।
নিউইয়র্ক সিটির একটি রেস্তোরাঁর মালিক রাজন তামাং জানান, কাঠমান্ডুতে থাকা পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে তিনি জানতে পেরেছেন, তার মা ও বোন মারা গেছেন। তাঁর আরও অনেক আত্মীয় ও বন্ধু নিখোঁজ।
নিউইয়র্কে এক শোক সমাবেশের পর তিনি বলেন, ‘আমার পরিবারের সদস্যরা তখন ঘুম থেকে উঠছিলেন। তারা কোনো তথ্যও পায়নি, হঠাৎ করেই এই বন্যা চলে আসে। কেউ নিখোঁজ, কেউ প্রাণ হারিয়েছে এবং মাত্র কয়েকজন বেঁচে আছে।’
দক্ষিণ ভারতের পুদুচেরিতে কর্মরত বিষ্ণুরাম রামাস্বামীর মা ও দুই বোন কৈলাস পর্বতে তীর্থযাত্রায় গিয়েছিলেন। বুধবার সকাল নয়টায় তিনি তাঁদের সঙ্গে সর্বশেষ কথা বলেন।
তিনি বলেন, তার মা জানিয়েছিলেন, তারা সীমান্ত এলাকার দিকে যাচ্ছেন। হোটেলে পৌঁছে ফোন করবেন বলেছিলেন। এরপর আর যোগাযোগ করা যায়নি।
পরিবারের সদস্যদের সন্ধানে তিনি নেপাল ও ভারতের সরকারি কর্মকর্তাদের পাশাপাশি ভ্রমণ সংস্থাগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করছেন। এখনো কোনো তথ্য পাননি।
নিখোঁজ ব্যক্তিদের অনেকে তিব্বতের পবিত্র কৈলাস পর্বতে তীর্থযাত্রায় থাকতে পারেন। হিন্দু, বৌদ্ধসহ বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীর কাছে কৈলাস পবিত্র স্থান।
ভারতীয় আধ্যাত্মিক গুরু জগ্গি বাসুদেব, যিনি সদগুরু নামেও পরিচিত, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে জানান, একটি তীর্থযাত্রী দলের ৭৭ সদস্য সীমান্তের অভিবাসন কার্যালয়ে বন্যার মধ্যে আটকা পড়েছিলেন।
নেপালের পর্যটন বোর্ড জানিয়েছে, নিখোঁজদের মধ্যে ৫০০ জনের বেশি বিদেশি নাগরিক রয়েছেন।
হিমবাহের নিচের শিলা ধস থেকেই বিপর্যয়
উপগ্রহচিত্র বিশ্লেষণ করা বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, হিমালয়ের উঁচু অঞ্চলে একটি হিমবাহের নিচের শিলাস্তরের একটি অংশ ধসে পড়ে। এর সঙ্গে হিমবাহের একটি অংশও নিচে নেমে আসে।
শিলা ও গলিত পানি নিচের উপত্যকার নদীগুলোকে ফুলিয়ে তোলে। এরপর প্রবল পানির স্রোত ভাটি অঞ্চলের ভবন, সেতু ও মাটি ভাসিয়ে নিয়ে যায়।
দুর্যোগের ভয়াবহতা নিয়ে মন্তব্য করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও। তিনি বলেছেন, শক্তিশালী ও মজবুত ভবনগুলোও ‘কাঠির মতো’ ভেসে গেছে।
ওভাল অফিসে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্র নেপালের নেতাদের সঙ্গে কথা বলেছে। প্রয়োজনীয় যেকোনো সহায়তা দিতে যুক্তরাষ্ট্র প্রস্তুত।
সম্পাদক: মো. আবু মুসা আশ'য়ারী (মনির)
প্রকাশক: ইলিয়াস
www.newsoutlook.net