‘মববিরোধী’ সরকার কি মব নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে?

লেখক: নিউজ আউটলুক ডেস্ক
প্রকাশ: ২ ঘন্টা আগে

বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকে গভর্নর পদ থেকে আহসান এইচ মনসুরকে সরানোর সময় তার উপদেষ্টাসহ তিন কর্মকর্তাকে ‘মব’ বা দলবদ্ধ বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে বের করে দেওয়ার অভিযোগ আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

এই ঘটনার ব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিএনপি সমর্থিত কর্মকর্তাদের দায়ী করা হচ্ছে।

সম্প্রতি ঢাকার বাইরে বরিশালে আদালতের এজলাসে এবং সুপ্রিমকোর্টে আইনজীবীদের কক্ষে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায়ও বিএনপি সমর্থিতদের বিরুদ্ধে ‘মব’ বা দলবদ্ধ বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অভিযোগ উঠেছে।

সদ্য বিদায় নেওয়া অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে আলোচনায় ছিল মব সৃষ্টি করে দেশের বিভিন্ন জায়গায় বাড়ি-ঘর-ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান, মাজারে হামলা, অগ্নিসংযোগের নানা ঘটনা।

যদিও নবনির্বাচিত বিএনপি সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পরদিনই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ‘মব কালচার শেষ’ বলে ঘোষণা দিয়েছিলেন। কিন্তু ১০ দিন পার হতে না হতেই নতুন এই সরকারের সময়ও মব সৃষ্টির পর পর কয়েকটি অভিযোগ এসেছে ।

এদিকে, বিরোধীদলীয় নেতা, জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান বাংলাদেশ ব্যাংকের ঘটনাকে ‘বর্তমান সরকার সমর্থিত মব কালচারের আনুষ্ঠানিক সূচনা’ বলে বর্ণনা করেছেন।

‘মব’ এর ব্যাপারে বিএনপি সরকারের ভূমিকা নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন বিরোধী রাজনীতিকদের অনেকে।

অপরাধ বিশ্লেষকেরা বলছেন, মবের এসব ঘটনায় এটাই প্রতিফলিত হয়েছে যে, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় সরকার প্রধানের চিন্তা-ভাবনা তার দলীয় নেতা-কর্মীরা ধারণ করতে পারছেন কি না, সেই প্রশ্ন থাকে।

অপরাধ বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক তৌহিদুল হক বলেন, ‘মবের মতো ঘটনায় দ্রুততম সময়ে আইনের প্রয়োগ করলে মব নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে সরকার।’

এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

তবে ক্ষমতাসীন দল বিএনপির একাধিক নেতা দাবি করেছেন, তাদের সরকার মবকে রাজনৈতিকভাবে প্রশ্রয় দেবে না। এ ব্যাপারে তারা কঠোর থাকবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকে ‘মব’ সৃষ্টির অভিযোগ

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর থাকার সময় আহসান এইচ মনসুরের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ঘিরে কর্মকর্তাদের একাংশ ক্ষুব্ধ হয়ে তার বিরুদ্ধে একটি সংবাদ সম্মেলন করে। এর সূত্র ধরেই মূলত বাংলাদেশ ব্যাংকে অস্থিরতা চলছিল।

ওই ঘটনায় তৎকালীন গভর্নর আহসান মনসুর তিনজন কর্মকর্তাকে প্রথমে কারণ দর্শানোর নোটিশ এবং পরে মঙ্গলবার ঢাকার বাইরে তাদের বদলি করার নির্দেশ দেন।

ওই নোটিশ বা বদলির আদেশ বাতিলের দাবি তুলে বুধবার প্রতিবাদ সভা করেন কর্মকর্তাদের একাংশ। অফিসার্স ওয়েলফেয়ার কাউন্সিলের ব্যানারে ওই প্রতিবাদ সভা আয়োজন করা হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এই কর্মকর্তারা বিএনপিপন্থী হিসেবে পরিচিত।

তাদের ক্ষোভ ও প্রতিবাদ কর্মসূচির মুখে একপর্যায়ে আহসান এইচ মনসুর এক জরুরি সংবাদ সম্মেলন করেন। সেখানে তিনি দাবি করেন, একটি কুচক্রী মহলের ইন্ধনে কর্মকর্তাদের এই আন্দোলন।

সংবাদ সম্মেলনের পরপরই আহসান মনসুর বেলা আড়াইটায় কর্মস্থল ত্যাগ করেন।

বুধবার প্রতিবাদ সভা পাল্টা সংবাদ সম্মেলন, বাংলাদেশ ব্যাংকেএমন অস্থির পরিস্থিতির মধ্যেই আহসান মনসুরকে সরিয়ে দেওয়া ও নতুন গভর্নর নিয়োগের সরকারের সিদ্ধান্ত আসে।

এই খবর ছড়িয়ে পড়লে প্রতিবাদে অংশ নেওয়া কয়েকজন কর্মকর্তা আহসান মনসুরের পিএস ও বাংলাদেশ ব্যাংকের অতিরিক্ত পরিচালক কামরুল ইসলামকে বাংলাদেশ ব্যাংকের কার্যালয় থেকে জোর করে বের করে দেন।

তবে কেবল কামরুল ইসলামই নয়, সাবেক গভর্নরের উপদেষ্টা ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক আহসান উল্লাহ ও নিরাপত্তা বিভাগের পরিচালক ফারুক হাওলাদারকেও একইভাবে বের করে দেওয়া হয়।

সাবেক গভর্নরের উপদেষ্টা আহসান উল্লাহকে বের করে দেওয়ার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে।

এতে দেখা যাচ্ছে, কয়েকজন মিলে ধাক্কা দিতে দিতে তাকে কার্যালয় থেকে বের করছেন।

একপর্যায়ে গাড়িতে ওঠার সময় আহসান উল্লাহকে ঘিরে ধরে অশ্লীল ভাষা করতে দেখা যায় বিক্ষুব্ধদের।

তাকে গাড়িতে উঠতেও বাধা দেওয়া হয়। পরে বাংলাদেশ ব্যাংকেরই দু’জন নির্বাহী পরিচালক ও নিরাপত্তা প্রহরীর সহায়তায় তিনি গাড়িতে উঠে চলে যান।

এ ঘটনাগুলো মব বা দলবদ্ধ বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে ঘটানো হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে।

এরপর নতুন গভর্নর নিয়োগের পরই তিন কর্মকর্তার বদলির আদেশ প্রত্যাহার করা হয়। সাবেক গভর্নরের পিএস কামরুল ইসলামকে হেড অফিস থেকে সদরঘাট শাখায় বদলি করা হয়।

বরিশালে আদালতে বিশৃঙ্খলা

ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সমর্থিত আইনজীবীদের জামিন দেওয়ার কারণে মঙ্গলবার বরিশালে বিচার চলাকালীন আদালতের এজলাসে ঢুকে হট্টগোল করা হয়।

এই ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে বরিশাল জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি বিএনপিপন্থী আইনজীবী সাদিকুর রহমান লিংকনসহ কয়েকজন আইনজীবীর বিরুদ্ধে।

ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে আদালতেও ‘মব’ সৃষ্টির অভিযোগ ঘিরে চলছে আলোচনা-সমালোচনা।

পরে বুধবার লিংকনকে গ্রেফতার করে আদালতে হাজির করা হয়। ওই গ্রেফতারের প্রতিবাদে বিক্ষোভ করেন বিএনপিপন্থী আইনজীবীরা।

এই ঘটনায় আইনজীবী সমিতির সভাপতি, সাধারণ সম্পাদকসহ ১২ জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতনামা আরো তিন থেকে আটজনের বিরুদ্ধে দ্রুত বিচার আইনে মামলা দায়ের করেছেন বরিশালের অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বেঞ্চ সহকারী রাজিব মজুমদার।

পরে লিংকনের জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে তাকে কারাগারে পাঠিয়েছে বরিশালের বিচারিক আদালত।

এদিকে এই ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে, আদালতের স্বাভাবিক কার্যক্রম নির্বিঘ্ন রাখতে সকলকে সংযম, দায়িত্বশীলতা ও আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল আচরণ প্রদর্শনের জন্য আহ্বান জানিয়েছে সুপ্রিমকোর্ট কর্তৃপক্ষ।

এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে বলেও জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

বরিশাল জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি সাদিকুর রহমান লিংকন, সম্পাদক মির্জা রিয়াজুল ইসলামসহ সমিতির নয়জন আইনজীবীর বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার অভিযোগেও রুল জারি করেছে হাইকোর্ট।

স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে হাইকোর্টের একটি দ্বৈত বেঞ্চ এই কারণ দর্শানোর নোটিশ জারি করেছে।

কেন তাদের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার কার্যক্রম শুরু করা হবে না এবং শাস্তি কেন দেওয়া হবে না, সে বিষয়ে জানতে চাওয়া হয়েছে ওই নোটিশে।

ওই নয় আইনজীবীকে ১০ দিনের মধ্যে কারণ দর্শানোর নোটিশের জবাব দিতে নির্দেশ দিয়েছে হাইকোর্ট। এ বিষয়ে পরবর্তী শুনানি ১১ মার্চ।

সুপ্রিমকোর্টে আইনজীবীদের কক্ষে ভাংচুর ও হামলা

বরিশাল আদালতের পর হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গনেও।

বুধবার দুপুর আড়াইটার দিকে সুপ্রিমকোর্টে আওয়ামীপন্থী কয়েকজন আইনজীবীর কক্ষে হামলা-ভাঙচুর চালানো হয়।

কারণ আওয়ামীপন্থী আইনজীবীরা বরিশালে আদালতের এজলাসে হামলার প্রতিবাদে সুপ্রিমকোর্ট প্রাঙ্গণে মানববন্ধন করেছিলেন।

এই হামলার ঘটনায়ও বিএনপিপন্থী জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে।

যে আইনজীবীদের কক্ষে হামলা-ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে, তাদের মধ্যে আইনজীবী চঞ্চল কুমার বিশ্বাস দাবি করেন, জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের ২০-২৫ জন এই হামলা-ভাঙচুরের ঘটনা ঘটায়।

বিশ্বাস জানান, আওয়ামীপন্থি আইনজীবীরা এই ঘটনা প্রধান বিচারপতিকে অবহিত করেছেন।

তবে এই ঘটনার বিষয়ে এখনো আইনজীবী সমিতিতে অভিযোগ করা হয়নি এবং সমিতির সভাপতিকে অবহিত করা হবে বলেও জানান তিনি।

এদিকে, বিএনপি সমর্থিত আইনজীবীদের একজন নেতা মব সৃষ্টি করে হামলার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

বাসসের এমডিকে বের করে দেওয়া হয়

নতুন সরকারের শপথের পরদিনই ১৮ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বাসসে অস্থিরতা দেখা দেয়।
ওইদিন প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান সম্পাদক মাহবুব মোর্শেদকে বের করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।

মাহবুব মোর্শেদের বিরুদ্ধে অপেশাদার আচরণ এবং একনায়কতান্ত্রিকভাবে প্রতিষ্ঠান পরিচালনার অভিযোগ এনেছেন বিক্ষুব্ধরা।

প্রতিষ্ঠানটির প্রধান বার্তা সম্পাদক মো. মানিকুল আজাদ বলেন, কর্মীদের সঙ্গে খারাপ আচরণের কারণে অনেকদিন ধরেই তার ওপর ক্ষোভ বিরাজ করছিল। যদিও এমন অভিযোগ অস্বীকার করেছিলেন মাহবুব মোর্শেদ।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া একটি পোস্টে এসব ঘটনার পেছনে অফিসে মব সৃস্টি করে, হামলা করে তাকে সরানো হলো কেন, এমন প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। একইসাথে এ ঘটনায় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বা বিএনপিকে দায়ী করেছেন তিনি।

দলটি মব সৃষ্টির অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

উল্লেখ্য, আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর ২০২৪ সালের ১৭ আগস্ট দুই বছরের চুক্তিতে মোর্শেদকে বাসসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিল বিগত অন্তর্বর্তী সরকার।

‘দ্রুত আইনী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে’

মানবাধিকার কর্মী ও অপরাধ বিশ্লেষকেরা বলছেন, একেক সরকারের সময় ‘মব ভায়োলেন্স’ এর মত অপরাধ একেক ধরনের রূপ ধারণ করে। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে রাজনৈতিক শূন্যতা ও বিচারহীনতার কারণেই মব সৃষ্টি করে হামলার ঘটনা বেড়েছিল বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।

মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন বা এমএফএস এর প্রধান নির্বাহী আইনজীবী সাইদুর রহমান বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক, বরিশাল আদালত, সুপ্রিম কোর্টে আইনজীবীদের কক্ষে ভাঙচুর সব ঘটনাই মবের আরেক রূপ।

তবে মব নিয়ন্ত্রণে এখন এই রাজনৈতিক সরকারের সদিচ্ছা রয়েছে। বরিশালের ঘটনায় সেটি দৃশ্যমান হয়েছে বলে উল্লেখ করেন সাইদুর রহমান।

এই মানবাধিকার কর্মী প্রত্যাশা করছেন, সময়ের ব্যবধানে এই রাজনৈতিক সরকার ‘মব’ এর মত অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে।

অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক বলেন, রাজনৈতিক শক্তি ব্যবহার করে কাউকে পদত্যাগে বাধ্য করা, অসম্মান করা বা শক্তি প্রদর্শনের মতো ঘটনাকে বিক্ষোভ, সংক্ষুব্ধ জনতার উচ্ছৃঙ্খল আচরণ যেভাবেই আখ্যায়িত করা হোক তা মবের সংজ্ঞার মধ্যেই পড়ে।

ফলে রাজনৈতিক দলের এই সরকারকে ‘মব’ এর মতো অপরাধ সতর্কতার সাথে আইনগতভাবেই নিয়ন্ত্রণ করতে হবে বলে মনে করেন তিনি।

বরিশাল আদালতের ঘটনায় যেভাবে আইনী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে সেটা ওই অঙ্গনের জন্য একটি বার্তা, তাই অন্যান্য ক্ষেত্রেও এমন কঠোর আইনি পদক্ষেপ নিতে হবে বলে মনে করেন তৌহিদুল হক।

তিনি বলেন,’মব এর ক্ষেত্রে সাংগঠনিক ব্যবস্থা এবং প্রচলিত ফৌজদারি আইনানুযায়ী দ্রুত গতিতে ব্যবস্থা গ্রহণ করলে তা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।’

সূত্র : বিবিসি