
দুবাই থেকে বার্তা সংস্থা এএফপি জানায়, মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই হুথিরা তাদের মিত্রদের প্রতি সমর্থন জানিয়ে আসছিল। এতদিন তারা এ যুদ্ধে সরাসরি অংশ না নিলেও সতর্ক করে বলেছিল যে, তাদের আঙুল ‘ট্রিগারে’ রয়েছে।
অবশেষে শনিবার তারা সেই ট্রিগার চেপেছে। জানিয়েছে, তারা ইসরাইলি সামরিক অবকাঠামোতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। ইসরাইলও ইয়েমেন থেকে একটি ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার কথা নিশ্চিত করেছে এবং তা ঠেকাতে কাজ চলছে বলে জানিয়েছে।
চ্যাথাম হাউসের রিসার্চ ফেলো ফারিয়া আল-মুসলিমি বলেন, ‘এই গোষ্ঠীর যুদ্ধে প্রবেশ একটি গুরুতর এবং গভীর উদ্বেগের বিষয়।’
তিনি এএফপি’কে বলেন, হুথিদের এ অংশগ্রহণ ইতোমধ্যে অস্থির যুদ্ধকে আরও বিস্তৃত করার ঝুঁকি তৈরি করেছে। বিশেষ করে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং বিশ্ব বাণিজ্যের ওপর এর ব্যাপক প্রভাব পড়তে পারে।
সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়াগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:
প্রত্যাশিত পদক্ষেপ
বিশ্লেষকরা দীর্ঘ দিন ধরেই ধারণা করছিলেন যে, হুথিরা শেষ পর্যন্ত এই যুদ্ধে যোগ দেবে। ২০১৪ সাল থেকে হুথিরা ইয়েমেনের রাজধানী সানাসহ দেশটির একটি বিশাল অংশ দখলে রেখেছে।
আল-মুসলিমি মনে করেন, হুথিরা সম্ভবত এই যুদ্ধ থেকে দূরে থাকার সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছিল। কারণ তারা জানত এটি তাদের জন্য কোনোভাবেই ভালো হবে না। কিন্তু দীর্ঘদিনের সমর্থক ইরানের প্রতি শেষ পর্যন্ত তাদের দায়বদ্ধতা পালন করতেই হলো।
গাজা যুদ্ধের সময়ের মতোই প্রথম হামলার জন্য তারা আমেরিকান স্বার্থের বদলে ইসরাইলকে লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বেছে নিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ঝুঁকি পরামর্শদাতা প্রতিষ্ঠান ‘বাশা রিপোর্ট’ এক্স-এ জানিয়েছে, এটি তাদের দেশের সমর্থক এবং বিদেশের মিত্রদের কাছে একটি পরিষ্কার বার্তা। বার্তাটি হলো, তাদের প্রধান লক্ষ্য এখনো ফিলিস্তিন ইস্যু। একইসঙ্গে ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, তারা যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের ওপর হামলা করবে না।
বাশা রিপোর্টের মতে, হুথিদের পরবর্তী পদক্ষেপ হতে পারে এই অঞ্চলের সমুদ্রপথে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজগুলোতে হামলা চালানো। তারা সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের কোনো স্থাপনায় হামলা না করে এই পথটি বেছে নিতে পারে। এতে করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধে জড়ানোর ঝুঁকি এড়ানো যাবে, আবার তাদের ওপর বড় ধরনের চাপও সৃষ্টি করা সম্ভব হবে।
ঝুঁকিতে দ্বিতীয় প্রণালী
লোহিত সাগরের পাশের পাহাড়ি দুর্গ থেকে হুথিরা ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে নৌ-চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত করতে পারে। গাজা যুদ্ধের সময়ও তারা এটি প্রমাণ করেছিল। ইসরায়েলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে দাবি করা জাহাজগুলোতে তারা হামলা চালিয়েছিল।
এর ফলে লোহিত সাগরের দক্ষিণ প্রান্তে অবস্থিত ‘বাব আল-মান্দেব’ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল কমে যায়। এই সরু জলপথটি ভারত মহাসাগর থেকে সুয়েজ খালে প্রবেশের প্রধান পথ।
ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যে সংযোগকারী লোহিত সাগর বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত নৌপথ। আরব উপদ্বীপের অপর প্রান্তে ইরান ‘হরমুজ প্রণালী’ কার্যত বন্ধ করে দেওয়ায় বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের প্রবাহের জন্য এই পথটি এখন আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এই পথ বন্ধ হলে বিকল্প হিসেবে দক্ষিণ আফ্রিকার ‘কেপ অব গুড হোপ’ হয়ে ঘুরে যেতে হবে। বাব আল-মান্দেব প্রণালী হুমকির মুখে পড়লে ভঙ্গুর বিশ্ববাজার আরও বেশি অস্থিতিশীল হয়ে উঠবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সৌদি আরব সম্ভবত এটি মুখ বুজে সহ্য করবে না।
সৌদির অবস্থান কী বদলাবে?
হরমুজ প্রণালী বন্ধ থাকায় সৌদি আরবের তেলবাহী জাহাজগুলো এখন লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরে যাতায়াত করছে। কিন্তু এটিই এখন দেশটির তেল রপ্তানির শেষ নিরাপদ পথ।
যদি এই পথটিও বন্ধ হয়ে যায়, তবে রিয়াদ হয়তো তাদের বর্তমান অবস্থান থেকে সরে আসবে। বর্তমানে সৌদি আরব প্রায় প্রতিদিনই ইরানের ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা প্রতিহত করলেও কোনো পাল্টা ব্যবস্থা নিচ্ছে না।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক হিশাম আল-গানাম এএফপি’কে বলেন, ‘যুদ্ধে সৌদির এই সতর্ক নিরপেক্ষতা ভেঙে পড়তে পারে।’ তিনি মনে করেন, রিয়াদ সীমিত আকারে হলেও পাল্টা হামলার কথা চিন্তা করতে পারে।
আঞ্চলিক সংঘাতের বিস্তার
হুথিরা তাদের বিবৃতিতে প্রতিবেশী দেশগুলোতে হামলার ইঙ্গিত দিয়েছে। আল-মুসলিমি লক্ষ্য করেন, উপসাগরীয় অঞ্চলে সৌদি অবকাঠামো এবং পশ্চিমা ঘাঁটিগুলোতে হামলা চালানোয় হুথিরা ভৌগোলিকভাবে ইরানের চেয়ে বেশি সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে।
তিনি সতর্ক করেছেন যে, এ ধরনের হামলা ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে। এমনকি হুথি ও সৌদি আরবের মধ্যে সরাসরি সংঘাতের ঝুঁকিও রয়েছে। এর আগে ২০১৫ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত সৌদির নেতৃত্বাধীন জোটের সঙ্গে হুথিদের দীর্ঘ যুদ্ধ চলেছিল।
যদি ইয়েমেন আবারও যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে, তবে সাধারণ মানুষই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আগের যুদ্ধের ক্ষত এখনো বয়ে বেড়ানো দেশটির সাধারণ মানুষের জন্য এটি হবে এক চরম মানবিক বিপর্যয়।
সূত্র : বাসস
সম্পাদক: মো. আবু মুসা আশ'য়ারী (মনির)
প্রকাশক: ইলিয়াস
www.newsoutlook.net