১৭ বছরের ধারাবাহিক গণতান্ত্রিক সংগ্রাম এবং শত-সহস্র শহিদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত বিজয় কোনো একক গোষ্ঠীর চেতনা বিক্রির হাতিয়ার হতে পারে না বলে মন্তব্য করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
তিনি বলেছেন, ফ্যাসিবাদের পুনরুত্থান রোধে উসকানিমূলক ফাঁদে পা না দিয়ে গণতান্ত্রিক চর্চা ও সহনশীলতার মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রকাঠামোর গণতান্ত্রিক সংস্কারের কাজ সম্পন্ন করতে হবে।
শনিবার দুপুরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবন মিলনায়তনে জুলাই গণঅভ্যুত্থান ২০২৪-এর দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি উপলক্ষে ‘ফ্যাসিস্ট সরকার পতনে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের ভূমিকা’ শীর্ষক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাদা দল এবং ইউনিভার্সিটি টিচার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ইউট্যাব) যৌথভাবে এ আলোচনা সভার আয়োজন করে। ঢাবি সাদা দলের আহ্বায়ক ও ইউট্যাবের মহাসচিব অধ্যাপক ড. মো. মোর্শেদ হাসান খানের সভাপতিত্বে সভায় বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ১৭ বছরের ধারাবাহিক গণতান্ত্রিক সংগ্রাম এবং শত-সহস্র শহিদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত এই বিজয় কোনো একক গোষ্ঠীর চেতনা বিক্রির হাতিয়ার হতে পারে না। ফ্যাসিবাদের পুনরুত্থান রোধে উসকানিমূলক ফাঁদে পা না দিয়ে গণতান্ত্রিক চর্চা ও সহনশীলতার মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রকাঠামোর গণতান্ত্রিক সংস্কারের কাজ সম্পন্ন করতে হবে।
মন্ত্রী বলেন, ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদের অধীনে যে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়েছিল, তা ছিল দেশের গণতন্ত্রকামী জনগণের আরাধনার ফল।
তিনি বলেন, দীর্ঘ ১৭ বছরের জুলুম-নির্যাতন, গুম-খুন ও ভোটাধিকার হরণের বিরুদ্ধে ছাত্র-গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার পতন ঘটেছে। আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনার রাজনীতির মৃত্যু হয়েছে ঢাকায়, আর দাফন হয়েছে দিল্লিতে। ফলে চেতনা বিক্রির রাজনীতি দিয়ে আর বাংলাদেশের মানুষকে বিভ্রান্ত করা যাবে না।
রাষ্ট্রকাঠামোর গণতান্ত্রিক সংস্কার ও সংবিধান সংশোধনের ভবিষ্যৎ রূপরেখা তুলে ধরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ভবিষ্যতে কোনো নির্বাচিত সরকার যাতে স্বৈরাচারী হয়ে উঠতে না পারে, সে জন্য সংবিধানে প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সর্বোচ্চ দুই মেয়াদে সীমাবদ্ধ করার বিধান যুক্ত করা হবে। পাশাপাশি সংসদের উচ্চকক্ষ ও নিম্নকক্ষের মধ্যে চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স নিশ্চিত করা হবে বলেও জানান তিনি।
তিনি বলেন, পৃথিবীর সব গণতান্ত্রিক দেশের সংবিধান ধারাবাহিকভাবে সমাজের প্রয়োজন ও চাহিদার নিরিখে সংশোধন করা হয়েছে। একইভাবে গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী জনআকাঙ্ক্ষা ও জনপ্রত্যাশা পূরণে বাংলাদেশের সংবিধানও গণতান্ত্রিক উপায়ে সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
শিক্ষার্থী ও তরুণদের উদ্দেশে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, রাজনৈতিক অপরিপক্কতার পরিচয় দিয়ে উসকানিমূলক বক্তব্য দেওয়া যাবে না।
বুয়েটসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রদের ফাঁদে ফেলার অপচেষ্টা চলছে উল্লেখ করে তিনি সবাইকে ধৈর্য, সহনশীলতা ও গণতান্ত্রিক উপায়ে প্রতিবাদ জানানোর আহ্বান জানান।
ভারতের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের বিষয়ে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক হবে পারস্পরিক মর্যাদা, সম্মান ও সার্বভৌম সমতার ভিত্তিতে।
তিনি বলেন, একদিকে ভারতের মাটিতে বসে দণ্ডিত ও পলাতক আসামি হাসিনাকে বাংলাদেশবিরোধী বক্তব্য বা রাজনৈতিক অপতৎপরতা চালানোর সুযোগ দেওয়া হবে, আর অন্যদিকে বাংলাদেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক চাওয়া হবে—এ দুটি অবস্থান সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, ভারত সরকার এ বিষয়টি অনুধাবন করবে এবং ‘হাসিনা কার্ড’ খেলা বন্ধ করবে।
সভায় জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহিদ পরিবারের সদস্যদের পক্ষ থেকে অনুভূতি ব্যক্ত করেন শহিদ মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধের ভাই মীর মাহবুবুর রহমান স্নিগ্ধ, শহিদ ওয়াসিম আকরামের পিতা শফিউল আলম, শহিদ আবু সাঈদের ভাই মো. আবু হোসেন এবং শহিদ একরামুল হক সাজিদের মাতা নাজমা খাতুন লিপি।
অনুষ্ঠানে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আত্মোৎসর্গকারী শহিদদের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে তাঁদের পরিবারের সদস্যদের হাতে বিশেষ সম্মাননা স্মারক তুলে দেওয়া হয়।
পরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জুলাই গণঅভ্যুত্থান উপলক্ষে আয়োজিত বিশেষ আলোকচিত্র প্রদর্শনী ঘুরে দেখেন।
আলোচনা সভায় বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, সামাজিক-রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
