
মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করা ইশরাক হোসেনের পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেছেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
মঙ্গলবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে।
প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, সরকারের মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনের পদত্যাগপত্র রাষ্ট্রপতি কর্তৃক গৃহীত হয়েছে। এ পদত্যাগ অবিলম্বে কার্যকর হবে।
এরআগে, গতকাল সোমবার বেলা আড়াইটার দিকে রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে করে ইশরাক প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করার ঘোষণা দেন। নিয়ম অনুযায়ী পদত্যাগপত্র জমা দেওয়ার পর তা গ্রহণ করেন রাষ্ট্রপতি। পরে এ বিষয়ে মন্ত্রপরিষদ বিভাগ প্রজ্ঞাপন জারি করে।
বিএনপি নেতা ইশরাক ঢাকা-৬ আসনের সংসদ সদস্য। বর্তমানে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে মন্ত্রীর দায়িত্বে আছেন আহমেদ আযম খান। তার সঙ্গে প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন ইশরাক।
গত শনিবার বিকেলে রাজধানীর গেন্ডারিয়া রেলস্টেশনসংলগ্ন দয়াগঞ্জ গুন্টিঘর রেলগেট এলাকায় মাদকবিরোধী অভিযানে যান ইশরাক হোসেন। তার নিজের ফেসবুক পেজে প্রকাশ করা ভিডিওতে দেখা যায়, গাড়ি থেকে নেমেই আগ্নেয়াস্ত্র উঁচিয়ে চিৎকার করে বলছেন, ‘এই ধর ধর ধর…।’
তার পাশ থেকে একজনকে বলতে শোনা যায়, ‘একেবারে গুলি করে দেব।’ এ সময় প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে থাকা দেহরক্ষীরা কয়েকজনকে ধরতে দৌড়ান। তাদের একজন এক তরুণকে লাথি দেন। কয়েকজনকে বলতে শোনা যায়, ‘স্যার, আমি কিছু করিনি। আমি গরিব মানুষ, স্যার।’
আরেকটি ভিডিওতে আটক ব্যক্তিদের পুলিশের হাতে তুলে দিতে দেখা যায়। ঘটনাস্থলে প্রতিমন্ত্রীর নিজের নিয়োগ দেওয়া দুই দেহরক্ষী তোফাজ্জল হোসেন ও লাভলুর পাশাপাশি একজন সরকারি দেহরক্ষীও ছিলেন। নিজের নিয়োগ দেওয়া দেহরক্ষীদের কাছেও অস্ত্র ছিল। ভিডিওর কিছু অংশে ইশরাকের হাতে থাকা পিস্তল অস্পষ্ট করে দেওয়া হলেও অন্য অংশে অস্ত্রটি স্পষ্ট দেখা যায়। গুলি করার হুমকি দেওয়া ব্যক্তির পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। এ নিয়ে বিএনপি ও সরকারের ভেতরেও অস্বস্তি ও অসন্তোষ তৈরি হয়।
ঘটনার পর প্রশ্ন ওঠে, একজন প্রতিমন্ত্রী এভাবে অস্ত্র প্রদর্শন করে মাদকবিরোধী অভিযান চালাতে পারেন কি না। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ২০২৫ সালের আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স প্রদান, নবায়ন ও ব্যবহার নীতিমালার ২৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, আত্মরক্ষার জন্য লাইসেন্সপ্রাপ্ত অস্ত্র বহন ও ব্যবহার করা গেলেও অন্যের মনে ভয় বা বিরক্তির সৃষ্টি হতে পারে—এমনভাবে অস্ত্র প্রদর্শন করা যাবে না।
ইশরাকের অস্ত্র প্রদর্শনের ঘটনাটি তদন্ত করছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। গতকাল রোববার ডিএমপির গণমাধ্যম কেন্দ্রে সংবাদ সম্মেলনে গোয়েন্দা বিভাগের প্রধান শফিকুল ইসলাম জানান, ওয়ারী বিভাগের উপকমিশনারকে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এ ঘটনায় আইনের কোনো ব্যত্যয় হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। আইন লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অস্ত্রকাণ্ড নিয়ে সমালোচনার মধ্যে রোববার নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে বিবৃতি দেন ইশরাক হোসেন। এতে তিনি দাবি করেন, মাদকবিরোধী সামাজিক প্রতিরোধ কর্মসূচিতে অংশ নিতে সেখানে গিয়েছিলেন। কর্মসূচিটি পুলিশ, স্থানীয় রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতাদের যৌথ সিদ্ধান্তে নেওয়া হয়েছিল।
মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী থাকাকালে ইশরাকের এমন কর্মকাণ্ড নিয়ে বিএনপি ও সরকারের ভেতরে অসন্তোষ তৈরি হয়। পরদিন রোববার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাকে পদত্যাগের নির্দেশ দেন।
পদত্যাগের নির্দেশের খবর প্রকাশের পর তা অস্বীকার করেন ইশরাক। তার পক্ষ থেকে প্রতিবাদ জানিয়ে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারিও দেওয়া হয়। শেষ পর্যন্ত গতকাল দুপুরে জাতীয় প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে প্রতিমন্ত্রীর পদ ছাড়ার ঘোষণা দেন তিনি।
ইশরাককে পদত্যাগের নির্দেশ দেওয়ার আগে বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের নাম আসায় বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টিকে পদ ছাড়তে হয়েছিল।
গত ২৫ সেপ্টেম্বর রাজধানীর মিরপুরে রাড্ডা স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে হামলা, লুটপাট ও ভবন গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা ঘটে। এতে মিষ্টির ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত স্থানীয় বিএনপি ও যুবদলের কয়েকজনের নাম সামনে আসে। ঘটনা নিয়ে সরকার ও দলের ভেতরে অস্বস্তি তৈরি হয়। মিষ্টির রাজনৈতিক দায় নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। যদিও তিনি হামলা-ভাঙচুরে নিজের সম্পৃক্ততার অভিযোগ অস্বীকার করেন।
প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশনার পর ১ অক্টোবর স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন মিষ্টি। পরে তার আসন শূন্য ঘোষণা করে সংসদ সচিবালয়।
মিষ্টির পদত্যাগের আড়াই সপ্তাহের মধ্যে এবার অস্ত্রকাণ্ডে প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনকে মন্ত্রিসভা ছাড়ার নির্দেশ দিলেন প্রধানমন্ত্রী। দুটি ঘটনাতেই দল ও সরকারকে বিব্রত করা কর্মকাণ্ডের পর পদত্যাগের নির্দেশ এল।
বর্তমানে প্রধানমন্ত্রী ছাড়া মন্ত্রিসভায় ২৬ জন পূর্ণ মন্ত্রী রয়েছেন। প্রতিমন্ত্রী ছিলেন ২৪ জন। ইশরাকের পদত্যাগের পর প্রতিমন্ত্রীর সংখ্যা দাঁড়াল ২৩ জনে।
সম্পাদক: মো. আবু মুসা আশ'য়ারী (মনির)
প্রকাশক: ইলিয়াস
www.newsoutlook.net