কর্মকর্তাদের হত্যার 'কঠোর প্রতিশোধ' নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে ইরানের সেনাবাহিনী

চলতি সপ্তাহে হামলায় নিহত ইরানের নিরাপত্তা প্রধান আলী লারিজানি এবং আধাসামরিক বাহিনী বাসিজ-এর প্রধান গোলামরেজা সোলাইমানির জানাজায় অংশ নিতে রাজপথে নেমে আসেন লাখ লাখ মানুষ। জানাজায় অংশ নেওয়া মানুষের হাতে ছিল শীর্ষ নেতাদের ছবি, কণ্ঠে ছিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিশোধের স্লোগান। সাধারণ মানুষের পাশাপাশি দেশটির উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা ও সামরিক কমান্ডারেরা এই শোকানুষ্ঠানে শরিক হন। শহীদদের কফিন যখন তেহরানের রাজপথ দিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল, তখন এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়।
বুধবার (১৮ মার্চ) রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় এই বীরদের শেষ বিদায় জানায় ইরান। এসব কর্মকর্তাদের হত্যার ‘কঠোর প্রতিশোধ’ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে ইরানের সেনাবাহিনী।
তথ্য অনুযায়ী, গত ১৭ মার্চ তেহরানে ইসরাইলি বিমান বাহিনীর অতর্কিত হামলায় আলী লারিজানি এবং তার ছেলে শাহাদাতবরণ করেন। একই দিনে দখলদার ইসরাইলের পৃথক এক বিমান হামলায় প্রাণ হারান বাসিজ কমান্ডার মেজর জেনারেল গোলাম রেজা সোলাইমানি। এছাড়া জানাজায় অংশ নেওয়া নৌসেনারা গত ৪ মার্চ শ্রীলঙ্কা উপকূলে মার্কিন নৌবাহিনীর টর্পেডো হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত ইরানি যুদ্ধজাহাজ ‘দেনা’ ডেস্ট্রয়ারে কর্মরত ছিলেন।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ সৈয়দ আলী খামেনি এবং বেশ কয়েকজন শীর্ষ কমান্ডারকে হত্যার পর মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি অগ্নিগর্ভ হয়ে ওঠে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের এই উস্কানিহীন আগ্রাসনের পর থেকেই ইরানজুড়ে ব্যাপক বিমান হামলা চালানো হচ্ছে। এর পাল্টা জবাব হিসেবে ইরানের সশস্ত্র বাহিনীও ইসরাইলঅধিকৃত অঞ্চল এবং মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত বিভিন্ন মার্কিন সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা অব্যাহত রেখেছে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, শীর্ষ নেতাদের এই শাহাদাতবরণ যুদ্ধের ময়দানে ইরানকে আরো অনড় অবস্থানে নিয়ে যেতে পারে। তেহরান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, প্রতিটি ফোঁটা রক্তের বদলা নিতে তারা প্রস্তুত।
অন্যদিকে, জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলার জবাবে চূড়ান্ত পদক্ষেপ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে ইরানের সামরিক বাহিনী।
ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর বা আইআরজিসি সংশ্লিষ্ট সংবাদ সংস্থা তাসনিম এই বিবৃতি প্রকাশ করেছে।
ইরানের সামরিক বাহিনী এক বিবৃতিতে বলেছে, শত্রুপক্ষ দক্ষিণাঞ্চলে ইরানের জ্বালানি ও শক্তি অবকাঠামোর একাংশে হামলা চালিয়েছে।
বিবৃতিতে আরো বলা হয়, আগেও সতর্ক করা হয়েছিল যে, যদি আমেরিকান-জায়নবাদী শত্রু আমাদের দেশের জ্বালানি, শক্তি, গ্যাস এবং অর্থনৈতিক অবকাঠামোতে আক্রমণ করে, তবে শত্রুর বিরুদ্ধে শক্তিশালী পাল্টা আক্রমণের পাশাপাশি আমরা সেই আগ্রাসনের উৎসেও ভয়াবহ আঘাত হানব।”
বিবৃতিতে বলা হয়েছে, আমরা আগ্রাসনকারী দেশগুলোর জ্বালানি ও গ্যাস অবকাঠামোকে আমাদের বৈধ লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বিবেচনা করছি এবং এর কঠোর প্রতিশোধ নেব।
ইরানের গ্যাস স্থাপনাগুলোতে হামলার পর দেশটি থেকে ইরাকে গ্যাস আমদানি বন্ধ হয়ে গেছে। দেশটির বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়ের একটি প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে এই তথ্য জানিয়েছে ইরাকের স্থানীয় সংবাদমাধ্যম।
রয়টার্স সংবাদ সংস্থার মতে, ইরাক তাদের প্রয়োজনীয় গ্যাস ও বিদ্যুতের এক-তৃতীয়াংশের বেশি ইরানের কাছ থেকে আমদানি করে।
ইরাকি নিউজ এজেন্সিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে দেশটির বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র আহমেদ মুসা বলেন, অঞ্চলের সাম্প্রতিক পরিস্থিতির প্রভাবে ইরান থেকে ইরাকে গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে।
এদিকে, ইরানের বুশেহর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানিয়েছে রাশিয়া।
আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা বা আইএইএ জানিয়েছে, বিদ্যুৎ কেন্দ্রে একটি প্রজেক্টাইল আঘাতের খবর দিয়েছে ইরান।
সংস্থাটি আরো জানায়, এই ঘটনায় বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কোনো ক্ষতি হয়নি এবং কেউ আহতও হননি। তবে তারা সতর্ক করে বলেছে যে, এমন হামলা তেজস্ক্রিয় দূষণের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মারিয়া জাখারোভা এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, বুশেহর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ভেতরে, সক্রিয় চুল্লির মাত্র কয়েক মিটার দূরে এই দায়িত্বজ্ঞানহীন এবং সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র হামলার আমরা তীব্র নিন্দা জানাই।
তিনি আরো জানান, বিদ্যুৎ কেন্দ্রে এখনও কর্মরত রুশ নাগরিকদের বিষয়ে রাশিয়া আগেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলকে সতর্ক করেছিল।
সূত্র : বিবিসি, অন্যান্য
