
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর প্রশিক্ষণ, দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীকে ধীরে ধীরে একটি ‘হিউম্যান ক্যাপিটাল ডেভেলপমেন্ট প্ল্যাটফর্মে’ রূপান্তর করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর ৪৬তম জাতীয় সমাবেশ উপলক্ষে বুধবার (২০ মে) দেওয়া এক বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আনসার-ভিডিপি নিয়মিত কার্যক্রমের পাশাপাশি প্রযুক্তিগত দক্ষতা বৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি করছে। ‘সঞ্জীবন প্রকল্পের’ মাধ্যমে গ্রামভিত্তিক উদ্যোক্তা সৃষ্টি এবং ব্যাংক ও ওয়েলফেয়ার ট্রাস্টের মাধ্যমে জামানতবিহীন ঋণ দেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, এভিজবস (আনসার অ্যান্ড ভিডিপি জব পোর্টাল) সফটওয়্যার ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে দেশীয় ও বিদেশি কর্মসংস্থানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স নিয়ে আনসার ওয়েলফেয়ার ট্রাস্টের মাধ্যমে বিদেশে কর্মসংস্থানের উদ্যোগ সদস্যদের জন্য সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করবে।
তিনি আরও বলেন, জাপানি ভাষা শিক্ষা, ফ্রিল্যান্সিং, ডিজিটাল মার্কেটিং এবং সিক্স-জি ওয়েল্ডিংয়ের মতো আধুনিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বাহিনীর সদস্যদের ক্রমান্বয়ে একটি ‘হিউম্যান ক্যাপিটাল ডেভেলপমেন্ট প্ল্যাটফর্মে’ রূপান্তর করা হচ্ছে।
নিষ্ঠা, শৃঙ্খলা, পেশাদারত্ব ও দেশপ্রেমের মাধ্যমে আনসার ও ভিডিপি ভবিষ্যতে একটি ‘প্রযুক্তিনির্ভর মানবিক সামাজিক বাহিনী’ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে বলেও এ সময় আশাবাদ ব্যক্ত করেন প্রধানমন্ত্রী।
সরকারপ্রধান বলেন, যেকোনো সুশৃঙ্খল বাহিনীর জন্য ‘চেইন অব কমান্ড’ ও ‘ডিসিপ্লিন’ মেনে চলা অপরিহার্য ও অবশ্য পালনীয় নীতি। এই দুটি বিষয়ে সামান্যতম অবহেলা পরিলক্ষিত হলেও কোনো বাহিনী সুশৃঙ্খল হয়ে উঠতে পারে না। কোনো বাহিনীর মধ্যে ডিসিপ্লিনের অভাব দেখা দিলে তাদের সম্পর্কে জনমনে আস্থার সংকট সৃষ্টি হয়—এ বিষয়ে খেয়াল রাখা জরুরি।
মহান মুক্তিযুদ্ধে আনসার বাহিনীর ভূমিকার কথা স্মরণ করে তারেক রহমান বলেন, প্রায় ৪০ হাজার রাইফেল নিয়ে আনসার সদস্যরা স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। মুক্তিযুদ্ধে এ বাহিনীর ৬৭০ জন শহিদ হয়েছেন। তাদের অবদান কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করে তিনি মাগফেরাত কামনা করেন।
স্বাধীনতার পর শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের উদ্যোগে গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী (ভিডিপি) ও আনসার বাহিনীকে একীভূত করার বিষয়টি তুলে ধরে তিনি বলেন, সেই দূরদর্শী পদক্ষেপই আনসার ও ভিডিপিকে আজকের বহুমাত্রিক ও গণপ্রতিরক্ষায় সক্ষম বাহিনীতে পরিণত করার ভিত্তি স্থাপন করেছে।
তিনি আরও বলেন, পরবর্তীতে খালেদা জিয়া সরকারের সময় ১৯৯৫ সালে আনসার-ভিডিপি আইন প্রণয়নের মাধ্যমে এ বাহিনীকে স্বেচ্ছাসেবী কাঠামো থেকে একটি স্বতন্ত্র শৃঙ্খলা বাহিনীর মর্যাদা দেওয়া হয়, যা এই বাহিনীর প্রাতিষ্ঠানিক বিকাশে মাইলফলক।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী পরিস্থিতিতে থানার নিরাপত্তা, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় নিরাপত্তা সহায়তায় আনসার-ভিডিপি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
বাহিনীর বর্তমান কাঠামো তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী জানান, আনসার ও ভিডিপির চারটি প্রধান স্তম্ভ– ব্যাটালিয়ন আনসার, অঙ্গীভূত আনসার, থানা বা উপজেলা আনসার এবং ভিডিপি-টিডিপি সমন্বিতভাবে দেশের নিরাপত্তায় কাজ করছে। বর্তমানে ৪৭টি আনসার ব্যাটালিয়নের মধ্যে ১৬টি পার্বত্য চট্টগ্রামে নিয়োজিত। ৫২ হাজার অঙ্গীভূত আনসার দেশের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ও শিল্পকারখানায় নিরাপত্তা দিচ্ছে। এছাড়া ১৩ হাজারেরও বেশি হিল আনসার ও ভিডিপি সদস্য পাহাড়ে সম্প্রীতি জোরদারে কাজ করছেন।
তৃণমূল পর্যায়ে ভিডিপি ও টিডিপি সদস্যরা বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ, নারী নির্যাতন মোকাবিলা, মাদকবিরোধী কার্যক্রম এবং নগর নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় আনসার-ভিডিপিকে একটি নির্ভরযোগ্য ‘ফার্স্ট রেসপন্ডার’ বাহিনী হিসেবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বন্যা-অগ্নিকাণ্ডসহ বিভিন্ন দুর্যোগে এ বাহিনীর সাহসিকতা দৃষ্টান্তমূলক। পাশাপাশি রেইন ওয়াটার হারভেস্টিং, সোলার প্যানেল এবং বায়োগ্যাস প্লান্ট স্থাপনের মতো পরিবেশবান্ধব উদ্যোগ টেকসই উন্নয়নের পথে সহায়ক ভূমিকা রাখছে।
ক্রীড়া ক্ষেত্রে বাহিনীর সাফল্যের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, বাংলাদেশ গেমসে টানা তিনবার চ্যাম্পিয়ন হওয়ার স্বীকৃতিস্বরূপ ২০০৪ সালে এ বাহিনী ‘স্বাধীনতা পদক’ অর্জন করে। বর্তমানে আন্তর্জাতিক মানের ক্রীড়া আয়োজনে দেশের ১০টি ক্রিকেট স্টেডিয়ামের নিরাপত্তায় ৩৭৯ জন অঙ্গীভূত আনসার সদস্য মোয়েন করা হয়েছে।
তিনি জানান, ক্রীড়াকে পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে বর্তমান সরকার খেলোয়াড়দের জন্য স্পোর্টস কার্ড ও বেতন কাঠামো চালু করেছে, যার আওতায় আনসার-ভিডিপির ১৫ জন ক্রীড়াবিদও স্পোর্টস কার্ড পেয়েছেন।
বাহিনীর প্রশাসনিক ও কাঠামোগত সংস্কারের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আনসার ব্যাটালিয়ন বিধিমালা ২০২৬’, ‘ভিডিপি প্রবিধানমালা ২০২৬’, ‘অঙ্গীভূত আনসার বিধিমালা ২০২৬’ এবং ‘আনসার ব্যাটালিয়ন সদস্য নিয়োগ ও পদোন্নতি বিধিমালা ২০২৬’-এর খসড়া চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। এছাড়া উপজেলা পর্যায়ে কার্যক্রম শক্তিশালী করতে ‘উপজেলা আনসার প্রবিধানমালা ২০২৬’ প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও শৃঙ্খলা জোরদারে সদর দপ্তরে বায়োমেট্রিক উপস্থিতি ব্যবস্থা চালু করাকে জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থাপনার একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হিসেবে অভিহিত করেন তিনি।
দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ও সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনার মাধ্যমে আনসার ও ভিডিপি ভবিষ্যতে আরও দক্ষ ও গতিশীল বাহিনী হিসেবে দেশের কল্যাণে কাজ করবে বলে আশা প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী।
সুত্র: ইউএনবি
সম্পাদক: মো. আবু মুসা আশ'য়ারী (মনির)
প্রকাশক: ইলিয়াস
www.newsoutlook.net